শনিবার ২২ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ৯:৪৯ এএম


উপবৃত্তি বন্ধ দেড় কোটি শিক্ষার্থীর

নুর মোহাম্মদ

প্রকাশিত: ১১:১০, ১৮ জানুয়ারি ২০২০  

অন্যান্য বছরের মতো এবার নতুন বইয়ের সঙ্গে উপবৃত্তির টাকা পাচ্ছে না। `প্রকল্প শেষে নতুন প্রকল্প হবে`- এমন ফাঁদে আটকে গেছে প্রাথমিকের উপবৃত্তি। তবে নতুন প্রকল্প কবে পাস হবে, কবে নাগাদ উপবৃত্তি শুরু হবে তা কেউ বলতে পারছে না। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে এমন তথ্য জানা গেছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রাথমিক শিক্ষার জন্য উপবৃত্তি প্রকল্প (তৃতীয় পর্যায়) মেয়াদ গত ডিসেম্বর শেষ হয়েছে। এ প্রকল্পের আওতায় প্রায় দেড় কোটি শিক্ষার্থীকে উপবৃত্তির টাকা দেয়া হতো। কিন্তু গত তিন মাস ধরে প্রাথমিকের এসব শিক্ষার্থীর উপবৃত্তির টাকা বন্ধ রয়েছে। হতদরিদ্র শিক্ষার্থীরা উপবৃত্তির টাকা না পাওয়ায় নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরু হলেও শিক্ষাসামগ্রী কিনতে পারছে না। দ্রম্নত শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তির টাকা বিতরণের ব্যবস্থা না করলে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এসডিজি (সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট গোল) বাস্তবায়ন নিয়েও শঙ্কা রয়েছে। প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে এরই মধ্যে মাধ্যমিক স্তর বা ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছে সাড়ে ২৩ লাখ শিক্ষার্থী। গত ৩১ ডিসেম্বর উপবৃত্তি প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় এসব শিক্ষার্থী উপবৃত্তির টাকা আদৌ পাবে কিনা তা নিয়েও শঙ্কা রয়েছে।

প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, উপবৃত্তি সুবিধাভোগীর লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৭৮ লাখ ৭০ হাজার ১২৯ জন শিক্ষার্থী। প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্যায়ের মেয়াদ ২০১৫ সালের ৩০ জুন শেষ হয়। এরপরে আরও দুই বছর প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো হয়। ২০১৭ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত তৃতীয় পর্যায় প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। তৃতীয় পর্যায় প্রকল্পের মাধ্যমে প্রথমে ১ কোটি ৩০ লাখ শিক্ষার্থীকে উপবৃত্তি দেওয়া হয়, পরে এর সঙ্গে আরও ১০ লাখ শিক্ষার্থী যুক্ত হয়। প্রকল্পের নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হলে আরও দুই বছর সময় বাড়ানো হয়। গত ৩১ ডিসেম্বর প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়ে যায়। প্রকল্পের মূল ব্যয় ছিল ৩ হাজার ৮৫৫ কোটি ৬৭ লাখ টাকা। প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো হলে নতুন করে ব্যয় ধরা হয় ৬ হাজার ৯২৩ কোটি ৬ লাখ টাকা।

প্রকল্পের কর্মকর্তারা জানান, একজন শিক্ষার্থী বিশিষ্ট পরিবারকে মাসে ১০০ টাকা, দুই শিক্ষার্থী বিশিষ্ট পরিবারকে ২০০ টাকা, তিন শিক্ষার্থী বিশিষ্ট পরিবারকে ২৫০ টাকা ও চার শিক্ষার্থী বিশিষ্ট পরিবারকে মাসে ৩০০ টাকা করে উপবৃত্তি দেওয়া হয়। প্রতি তিন মাস পর পর উপবৃত্তির টাকা শিক্ষার্থীর অভিভাবকের মোবাইলে রূপালী ব্যাংকের শিওর ক্যাশের মাধ্যমে বিতরণ করা হয়। কিন্তু প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ায় গত তিন মাসে কোনো শিক্ষার্থীকে উপবৃত্তির টাকা দেওয়া হয়নি।

উপবৃত্তি প্রকল্পের কর্মকর্তারা জানান, উপবৃত্তি ১০০ টাকার পরিবর্তে ১৫০ টাকা দেওয়ার প্রস্তাব করে প্রকল্পের ডিপিপি (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব) পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে। বছরের শুরুতে প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে শিক্ষাসামগ্রী (খাতা, কলম, স্কুলব্যাগ) কিনতে ৫০০ টাকা করে দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। উপবৃত্তির মাসিক ১৫০ টাকা ও শিক্ষাসমাগ্রী বাবদ ৫০০ টাকা দিলে পাঁচ বছরে ১৬ হাজার কোটি টাকা দরকার হবে।

এ ব্যাপারে উপবৃত্তি প্রকল্প (তৃতীয় পর্যায়) পরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) মো. ইউসুফ আলী বলেন, প্রকল্প মেয়াদ আরও ২ বছর বাড়ানোর প্রস্তাব পরিকল্পনা কমিশনে আছে। প্রাথমিক ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় এ নিয়ে কাজ করছে। আশা করি খুব দ্রম্নত সময়ের মধ্যে প্রকল্প পাস হবে। এ সময়টুকুতে উপবৃক্তির যত বকেয়া টাকা হবে তা একসঙ্গে দেয়া হবে বলে জানান তিনি। তিনি বলেন, বকেয়া পরিশোধের জন্য শিক্ষার্থীদের তথ্য মাঠ পর্যায় থেকে সংগ্রহ করা হচ্ছে। প্রকল্প পাস হওয়ার মাত্রই দ্রম্নত সময়ের মধ্যে টাকা বিতরণের ব্যবস্থা করা হবে।

কিশোরগঞ্জ জেলার করিমগঞ্জ উপজেলার কলাতুলি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী রিতা পারভীন বলেন, অসচ্ছল অভিভাবকদের সন্তানরাই আমাদের স্কুলের বেশির ভাগ শিক্ষার্থী। উপবৃত্তি বিতরণের ফলে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতির হার বেড়েছে। ঝরেপড়া কমেছে। কিন্তু তিন মাস ধরে উপবৃত্তির টাকা বিতরণ বন্ধ থাকায় নতুন করে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। তিনি আরও বলেন, শিক্ষাবর্ষের প্রথম দিন শিক্ষার্থীরা নতুন বই পেলেও উপবৃত্তির টাকা না পাওয়ায় খাতা-কলম কিনতে পারছে না। অভিভাবকরা প্রতিদিন স্কুলে এসে এ ব্যাপারে খোঁজখবর নিচ্ছেন।

বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাকের শিক্ষা প্রোগ্রামের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মাসুম বিলস্নাহ বলেন, উপবৃত্তি বন্ধ থাকায় প্রাথমিক শিক্ষার প্রতি হতদরিদ্র শিক্ষার্থীদের আগ্রহ কমে যাবে। ঝরেপড়া বাড়বে। সর্বোপরি প্রাথমিক শিক্ষার এসডিজি বাস্তবায়নের ওপর প্রভাব পড়বে।

জানা গেছে, ১৯৯৯ সালে প্রাথমিক শিক্ষার জন্য উপবৃত্তি প্রকল্প চালু করে আওয়ামী লীগ সরকার। ২০০৮ সালে ফের প্রাথমিক শিক্ষার জন্য উপবৃত্তি প্রকল্প (দ্বিতীয় পর্যায়) গ্রহণ করে সরকার। প্রাথমিক শিক্ষার জন্য উপবৃত্তি প্রকল্পের (দ্বিতীয় পর্যায়) আওতায় সিটি করপোরেশন এবং পৌরসভা এলাকার বাইরের স্কুলের অসচ্ছল পিতা-মাতার সন্তানকে উপবৃত্তি সুবিধা দেওয়া হয়।

এডুকেশন বাংলা/এজেড

সব খবর
এই বিভাগের আরো খবর