রবিবার ২২ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ৫:২০ এএম


উদ্ভাবন এবং কর্মশালার নামে শিক্ষা অধিদপ্তরে কি হচ্ছে?

সাব্বির নেওয়াজ

প্রকাশিত: ০৮:২০, ৭ জুলাই ২০১৯   আপডেট: ১০:৩৯, ৭ জুলাই ২০১৯

শিক্ষা নিয়ে উদ্ভাবনীমূলক (ইনোভেশন) কাজে বিশেষ পারদর্শিতা দেখাতে পারা শিক্ষকদের জন্য আয়োজিত একটি সরকারি শিক্ষা সফরে চীন যাচ্ছেন শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা (মাউশি) অধিদপ্তরের ৯ কর্মকর্তা। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা একজন, বাকিরা মাউশির। তার মধ্যে দু`জন পরিচালক, চারজন উপপরিচালক ও দু`জন সহকারী পরিচালক রয়েছেন। এরই মধ্যে এ বিষয়ে সরকারি আদেশ (জিও) জারি করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। চলতি মাসের শেষে চীনের উদ্দেশে উড়াল দেবেন তারা।

মাউশির এই আট কর্মকর্তা হলেন- পরিচালক (কলেজ ও প্রশাসন) শাহেদুল খবির চৌধুরী, পরিচালক (প্রশিক্ষণ) প্রবীর কুমার ভট্টাচার্য, উপপরিচালক (সাধারণ প্রশাসন) মো. রুহুল মোমিন, উপপরিচালক (প্রশিক্ষণ) জহিরুল আলম, উপপরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) ড. জাহাঙ্গীর হোসেন, উপপরিচালক (মনিটরিং অ্যান্ড ইভল্যুয়েশন) সেলিনা জামান, সহকারী পরিচালক (সাধারণ প্রশাসন) মো. জাকির হোসেন ও সহকারী পরিচালক আশেকুল হক। তাদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপসচিব জাকিয়া পারভীন।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপসচিব (প্রশিক্ষণ) ইব্রাহীম ভূঁইয়ার স্বাক্ষর করা সরকারি আদেশে বলা হয়, উল্লিখিত কর্মকর্তারা ২৫ থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত অথবা যাত্রার তারিখ থেকে পাঁচ দিন উদ্ভাবক টিমের সদস্য হিসেবে চীন সফর করবেন।

মাউশি অধিদপ্তরে উদ্ভাবনীমূলক কাজ তদারক করার জন্য একটি টিম রয়েছে। এ বিষয়ে পৃথক অফিস আদেশও রয়েছে। মাউশির মোট ১০ কর্মকর্তা রয়েছেন সেখানে। পরিচালক (প্রশিক্ষণ) এ কমিটির আহ্বায়ক এবং সহকারী পরিচালক (প্রশিক্ষণ-২) সদস্য সচিব। মাউশির পরিচালক (কলেজ ও প্রশাসন) শাহেদুল খবির চৌধুরী ইনোভেশন টিমের সদস্য নন। তবুও এ সফরে যাচ্ছেন তিনি। সফরের বাকি সাতজন কর্মকর্তা উদ্ভাবনীমূলক কাজ দেখভালের দায়িত্বে থাকলেও এই শিক্ষা সফর আয়োজন করা হয়েছে মূলত স্কুল ও কলেজ পর্যায়ের শিক্ষকদের জন্য। অথচ শিক্ষকদের এ সফরে বাদ দেওয়া হয়েছে তাদেরই।

সংশ্নিষ্ট একাধিক সূত্রে জানা গেছে, শিক্ষা খাতে উদ্ভাবনীমূলক কাজে জড়িত শিক্ষকদের (ইনোভেটর) কাছ থেকে নিত্যনতুন আইডিয়া সংগ্রহ করে সরকার। এ জন্য দুই, তিন ও পাঁচ দিনের কর্মশালা করা হয় তাদের নিয়ে। দেওয়া হয় প্রশিক্ষণ। এরপর তাদের দেওয়া আইডিয়াগুলো প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের `অ্যাকসেস টু ইনফরমেশন বা এটুআই` প্রকল্পে পাঠানো হয়। এটুআই শিক্ষকদের এই আইডিয়াগুলো মূল্যায়ন করে মার্কিং করে। সেখানে নির্দিষ্ট নম্বরের মধ্যে মূল্যায়ন শেষে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেষ্ঠ ইনোভেটর নির্বাচিত করা হয়। শ্রেষ্ঠ উদ্ভাবক হিসেবে নির্বাচিতরাই মূলত সরকারি এই শিক্ষা সফরে বিদেশ ভ্রমণের সুযোগ পান। কয়েক বছর ধরে দেখা যাচ্ছে, শিক্ষকদের জন্য নির্ধারিত এই সফরে শিক্ষকের সংখ্যা ক্রমাগত কমছে।

গত বছরের শিক্ষা সফরে শ্রেষ্ঠ তিনজন উদ্ভাবক শিক্ষককে নেওয়া হলেও এবার নেওয়া হয়নি একজনকেও। এতে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন খোদ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারাই।

সূত্রগুলো জানায়, শিক্ষা খাতে উদ্ভাবনীমূলক কাজের জন্য শেষ হওয়া অর্থবছরে অর্থ মন্ত্রণালয় মোট দুই কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছিল। অর্থবছর শেষ হয়ে গেলেও মাউশি এখন পর্যন্ত এ খাতের মাত্র ২২ লাখ ৫০ হাজার টাকা খরচ করতে পেরেছে। গত ২৯ এপ্রিল এই খাতের অর্থছাড় করে অর্থ মন্ত্রণালয়। ২৮ মে মহা-হিসাবরক্ষকের অফিস থেকে চেক পায় মাউশি। উদ্ভাবনের এই কাজে উদ্ভাবকদের জন্য প্রশিক্ষণ, কর্মশালা, আইডিয়া উপস্থাপনসহ ইনোভেশনের বাকি সব কাজ বাদ দিয়ে মাউশির কর্মকর্তারা কেবল বিদেশ সফর নিয়ে উৎসাহ দেখাচ্ছেন। এ নিয়েও শিক্ষকদের ক্ষোভের শেষ নেই।

জানা গেছে, এর আগে শুধু ইনোভেটরদের (শিক্ষক) নিয়ে পাঁচ দিনের একটি শিক্ষা সফরের আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। ১০ সদস্যের ওই টিমে বগুড়ার তিনজন শিক্ষক ও ঢাকার চারজন শিক্ষক ছিলেন। গত ৩০ মে মহাপরিচালক অধ্যাপক সৈয়দ মো. গোলাম ফারুক অনুমোদনও দেন তাতে। এতে বেস্ট আইডিয়া দেওয়ার জন্য ইনোভেটরদের সঙ্গে মাউশির তিন কর্মকর্তার নামও ছিল। তারা হলেন সহকারী পরিচালক (কলেজ-২) মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন, সহকারী পরিচালক (একিউএইউ) কামরুন নাহার ও গবেষণা কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম লিটন। অজ্ঞাত কারণে সেই শিক্ষা সফর আর হয়নি। এখন সেই নথিও আর খুঁজে পাচ্ছেন না মাউশির কর্মকর্তারা। ফলে এ দফায়ও শিক্ষকদের ভাগ্যের শিকে ছিঁড়েনি।

জানা গেছে, ইনোভেশন টিমের সদস্য হিসেবে এ সফরে তালিকাভুক্ত হওয়া কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। তারপরও তালিকাভুক্ত করা হয়েছে তাদের। `জাতীয় শিক্ষা সপ্তাহ-২০১৯` উপলক্ষে গত ২৬ জুন মাউশি শ্রেষ্ঠ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান হিসেবে কিশোরগঞ্জ এস ভি সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শাহনাজ কবীরকে পুরস্কার দেয়। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটে এক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি পুরস্কার হিসেবে তার হাতে পদক, সনদ ও ক্রেস্ট তুলে দেন। এই পদক, সনদ ও ক্রেস্টে গুরুতর ভুল ছিল। প্রধান শিক্ষক শাহনাজ কবীর বলেন, "ভুলের বিষয়টি শুরুতে আমার নজরে আসেনি। বাসায় ফেরার পর ভুলগুলো চোখে পড়ে। আমি এস ভি সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হলেও পদকে `এম ভি` সরকারি `বালিক` উচ্চ বিদ্যালয় লেখা হয়েছে। একইভাবে সনদপত্রেও `এস ভি` না লিখে লেখা হয়েছে `এম ভি`, আবার বিদ্যালয়টি কিশোরগঞ্জের প্রতিষ্ঠান হলেও সনদপত্রে লেখা হয়েছে `ময়মনসিংহ`। পাশাপাশি ক্রেস্টেও `এস ভি` না লিখে লেখা হয়েছে `এম ভি`। সনদপত্রে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. সৈয়দ মো. গোলাম ফারুক ও মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মো. সোহরাব হোসাইনের যৌথ স্বাক্ষর রয়েছে।"

শাহনাজ কবীর জানান, এসব ভুল সংশোধনের জন্য পরদিন দুপুরে তিনি মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তরে যান। তবে তার অভিযোগ জানানোর জন্য পরিচালক, উপপরিচালকসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাউকে পাননি। ফলে ভুলে ভরা পুরস্কার নিয়েই ওই দিন সন্ধ্যায় ফিরে যান কিশোরগঞ্জে। মাউশির কয়েকজন কর্মকর্তা জানান, গুরুতর এই ত্রুটির জন্য নূ্যনতম একটি কারণ দর্শাও নোটিশও মাউশি গত দুই সপ্তাহে কাউকে দেয়নি। উল্টো জাতীয় শিক্ষা সপ্তাহের এই পদক, সনদ ও ক্রেস্টের দায়িত্বে থাকা মাউশির অন্তত চারজন কর্মকর্তা এবারের এই বিদেশ সফরে স্থান পেয়েছেন।

`শিক্ষকদের সফরে কর্মকর্তারা যাচ্ছেন কেন`- জানতে চাইলে মাউশি মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. সৈয়দ মো. গোলাম ফারুক বলেন, `এই সফরটি ইনোভেশন টিম আর মেন্টরদের জন্য। ইনোভেটরদের (শিক্ষক) নিয়ে আরেকটা ট্যুর পরে করা হবে। সেটার টাকা ছাড় হয়নি এখনও।`

`টাকা ছাড় হয়েছে এবং মাউশি অগ্রিম টাকাও তুলে খরচ করেছে`- জানানো হলে তিনি বলেন, `আমি পরে খবর নিয়ে দেখব।` মহাপরিচালক এ বিষয়ে আর মুখ খুলতে চাননি।

তবে মহাপরিচালক বললেও মাউশির একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে, সফরটি ইনোভেটরদের জন্যই আয়োজন করা হয়েছিল। এ ছাড়া আগামীতে আয়োজন করতে যাওয়া সফরে শিক্ষকদের রাখা হলেও মাউশি ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারাও বাদ যাবেন না তাতে।
সৌজন্যে: সমকাল

এডুকেশন বাংলা/এজেড

সব খবর
এই বিভাগের আরো খবর