শুক্রবার ২৩ আগস্ট, ২০১৯ ১২:২১ পিএম


উচ্চ মাধ্যমিকে সময়মতো বই পৌঁছানো নিয়ে শঙ্কা

মুসতাক আহমদ

প্রকাশিত: ০৯:২০, ৮ জুন ২০১৯   আপডেট: ১৬:৪৪, ৮ জুন ২০১৯

শিক্ষার্থীদের ঝুঁকির মধ্যে রেখেই এবার সরকারি তত্ত্বাবধানে থাকা উচ্চ মাধ্যমিকের তিনটি পাঠ্যবই মুদ্রণ ও বাজারজাতের উদ্যোগ নিয়েছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)। এ লক্ষ্যে ইতিমধ্যে একটি প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। ঈদের পর দাফতরিক কাজ শেষে প্রতিষ্ঠানটিকে উৎপাদনের অনুমতি দেয়া হবে। এ কাজে জুনের দ্বিতীয় সপ্তাহ লেগে যেতে পারে। অপরদিকে ১ জুলাই একাদশ শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের ক্লাস শুরু হবে। ফলে শিক্ষার্থীদের হাতে সময়মতো বই পৌঁছানো নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে। সরকারি তত্ত্বাবধানে থাকা তিনটি বই হচ্ছে- বাংলা, বাংলা সহপাঠ ও ইংরেজি।

গত কয়েক বছর ধরে ১৬-১৭টি প্রতিষ্ঠান এসব বই মুদ্রণ ও বাজারজাত করে আসছে। কিন্তু এরপরও প্রতি বছরই একাধিক চক্র নকল বই ছেপে বিক্রি করেছে। এতে একদিকে বেশি দামে নিম্নমানের কাগজের বই কিনতে হয়েছে ছাত্রছাত্রীদের। অপরদিকে লাখ লাখ টাকা রাজস্ব বঞ্চিত হয়েছে সরকার। এছাড়া একটি প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেয়ায় এবার শিক্ষার্থীদের নকল বই কেনার ঝুঁকি আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা আছে। কেননা, যেখানে ১৭টি প্রতিষ্ঠানও সারা দেশে আসল বই সরবরাহ করতে ও নকল ঠেকাতে পারেনি, সেখানে এবার একটিমাত্র প্রতিষ্ঠানের পক্ষে এ কাজ আরও দুরূহ হয়ে পড়বে। ফলে বাজারে বইয়ের সংকট দেখা দিতে পারে। এতে মনোপলি ব্যবসার দ্বার উন্মুক্ত হতে পারে। ১ জুলাই ক্লাস শুরু হয়ে গেলেই এ সংকটটি দৃশ্যমান হবে। তখন শিক্ষার্থীদের আসল-নকল নির্বিচারে বেশি দামে হলেও বই কেনা লাগতে পারে। ছাত্রছাত্রীদের এভাবে ঝুঁকির মধ্যে ফেলার জন্য সংশ্লিষ্টরা এনসিটিবির নীতি-নির্ধারকদের দায়ী করছেন।


জানতে চাইলে এনসিটিবি চেয়ারম্যান অধ্যাপক নারায়ণ চন্দ্র সাহা ২ জুন যুগান্তরকে বলেন, চারটি প্রতিষ্ঠান এবার এ কাজ নেয়ার আগ্রহ দেখিয়েছিল। সেগুলোর মধ্যে শেষ পর্যন্ত তিনটি নিতে অপারগতা প্রকাশ করে। তাই একটি প্রতিষ্ঠানকে কাজটি দেয়া হয়েছে। মূল্যায়ন কমিটি এক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ওই প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা আছে এবং পারবে বলেই কাজ দেয়া হয়েছে।

জানা গেছে, উচ্চ মাধ্যমিকে প্রায় তিন ডজন বিষয় পাঠ্য আছে। এগুলোর মধ্যে উল্লিখিত তিনটি বাদে বাকি বিষয়ের পাঠ্যবই প্রণয়ন, মুদ্রণ ও বাজারজাত করে বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। এক্ষেত্রে সরকার শুধু এসব বইয়ের কারিকুলাম তৈরি করে। সেটির আলোকে বই রচনা করে এনসিটিবির অনুমোদন নিতে হয়। বিনিময়ে বই প্রতি সরকার একটি নির্দিষ্ট অঙ্কের রাজস্ব পেয়ে থাকে।

উচ্চ মাধ্যমিকের ক্ষেত্রে মূল সমস্যা নকল বই। ঢাকার বাংলাবাজার, বগুড়া, যশোর এবং নোয়াখালীর চৌমুহনীকেন্দ্রিক একাধিক চক্র বই নকল করে বাজারে ছাড়ে। উচ্চ মাধ্যমিকে সরকারের তত্ত্বাবধানের বই তিনটির ক্ষেত্রে নকল রোধে সরকার বিশেষ কাগজের একটি ফর্মা করে। সেই কাগজকে ‘সিকিউরিটি পেপার’ বলা হয়। কিন্তু নকলবাজরা সিকিউরিটি পেপারের ধার ধারে না। এর ফলে শিক্ষার্র্থীদের হাতে নকল বই তুলে দিয়ে সরকারকে রাজস্ব বঞ্চিত করা হচ্ছে।

এবারে উচ্চ মাধ্যমিকের বই মুদ্রণ ও বাজারজাত করার কাজ পাওয়া একমাত্র প্রতিষ্ঠানের নাম অগ্রণী প্রিন্টার্স। ওই প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী কাওসার উজ্জামান যুগান্তরকে বলেন, চারটি প্রতিষ্ঠান টেন্ডারে অংশ নিলেও তিনটি শেষপর্যন্ত নিজেদের প্রতিযোগিতা থেকে তুলে নেয়। শর্তে বনিবনা হওয়ায় আমরা প্রায় ৩০ লাখ (বাংলা, বাংলা সহপাঠ ও ইংরেজি) বই ছাপানোর দায়িত্ব নিয়েছি। তিনি বলেন, সারা দেশে বই বাজারজাত করার চ্যানেল আমাদের আছে। আশা করছি, সব শিক্ষার্থীর হাতে ১ জুলাইয়ের আগেই বই পৌঁছাতে পারব। কোনো সমস্যা হবে না। এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, এনসিটিবি কথা দিয়েছে যে, নকল প্রতিরোধের ব্যবস্থা করবে। আমরা আশা করছি, এবার কোনো বই নকল হবে না।

তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বই নকলের এ রাস্তা এনসিটিবিই করে দিয়ে থাকে। প্রথমত, মুদ্রাকর ও প্রকাশকদের অনুরোধ সত্ত্বেও অতীতে নকল বন্ধে কখনোই কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি। এ ক্ষেত্রে সারা দেশে একটি চিঠি পাঠিয়ে দায়িত্ব শেষ করে। এছাড়া প্রয়োজনের তুলনায় কমসংখ্যক বই মুদ্রণের আদেশ দিয়ে থাকে। এর মাধ্যমে মূলত পরোক্ষভাবে নকল বইয়ের বাজার তৈরি করে দেয়া হয়। প্রকাশকদের অভিযোগ, এবারও প্রয়োজনের তুলনায় কমসংখ্যক বই মুদ্রণের উদ্যোগ নিয়েছে। কেননা, এবার এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় পাস করেছে সাড়ে ১৭ লাখ শিক্ষার্থী। কিন্তু এনসিটিবি প্রতি বিষয়ে মাত্র ৯ লাখ বই মুদ্রণ ও বাজারজাতের টেন্ডার দিয়েছে। এতে একদিকে বাকি সাড়ে ৮ লাখ বই নকলের রাস্তা তৈরি করে রাখা হয়েছে। অন্যদিকে এর ফলে সরকার প্রায় পৌনে ২ কোটি টাকা রাজস্ব বঞ্চিত হবে।

অপরদিকে সরকারের তত্ত্বাবধানে থাকা প্রতিটি বই থেকে এনসিটিবি রয়্যালটি হিসেবে মূল্যের ১১ শতাংশ পেয়ে থাকে। সেই হিসাবে ৯ কোটি বই থেকে প্রায় ৯৯ লাখ টাকা পাবে সরকার। এছাড়া প্রতিটি বইয়ের ‘নিরাপত্তা কাগজ’ বিক্রি করে পাবে আরও এক কোটি টাকা। অপরদিকে সাড়ে ৮ লাখ বই কম ছাপানোর কারণে রয়্যালটি এবং নিরাপত্তা কাগজ বাদ কমপক্ষে পৌনে ২ কোটি টাকা রাজস্ব হারাবে সরকার।

‘পুরনো’ বই-ই যাচ্ছে : এদিকে ২০১০ সালে প্রণীত শিক্ষানীতি অনুযায়ী ২০১২ সালে নতুন কারিকুলাম তৈরি করে সরকার। এর আলোকে ২০১৪ সালে বাংলা প্রথমপত্র (পদ্য, গদ্য, উপন্যাস ও নাটক) এবং ২০১৫ সালে ইংরেজি প্রথমপত্র বই নতুন রূপে তৈরি করে পাঠ্যক্রমে যুক্ত করা হয়। সাধারণত কোনো বিষয়ে নতুন পাঠ্যবই প্রবর্তিত হলে তার পর ক্লাসে পাঠদানকারী শিক্ষকদের কাছ থেকে মতামত নেয়া হয়। এর নাম ট্রাইআউট। ট্রাইআউটের মাধ্যমে বই পরিমার্জন হওয়ার কথা। পরে পরিমার্জিত বই ফের শিক্ষার্থীদের হাতে দিতে হয়। কিন্তু এবারও সেই ‘পুরনো’ বই-ই শিক্ষার্থীদের দেয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে। কেননা, এ সংক্রান্ত কার্যক্রম এনসিটিবি শেষ করতে পারেনি।

এ ব্যাপারে এনসিটিবি চেয়ারম্যান বলেন, ট্রাইআউটের প্রতিবেদনের ওপর কাজ চলছে। কাজ শেষ হলে পরিমার্জিত বই দেয়া হবে। আর বই মুদ্রণের দায়িত্ব পাওয়া প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী কাওসার উজ্জামান বলেন, পরিমার্জিত বই ছাপানো লাগতে পারে বলা হয়েছে। মুদ্রণের আগে বলা যাচ্ছে না এনসিটিবি কী ছাপতে দেয়।

সৌজন্যে: যুগান্তর

এডুকেশন বাংলা/এজেড

সব খবর
এই বিভাগের আরো খবর