বৃহস্পতিবার ১৪ নভেম্বর, ২০১৯ ১২:০৬ পিএম


উচ্চশিক্ষা এবং বেকারত্ব

অলোক আচার্য

প্রকাশিত: ১৮:২২, ২৭ অক্টোবর ২০১৯  

প্রতিটি ছাত্রছাত্রীর জীবনে উচ্চ শিক্ষা লাভের স্বপ্ন থাকে। এই স্বপ্ন সবার ক্ষেত্রে পূরণ হয় না। কেউ কেউ মাঝপথেই ঝরে পরে। বর্তমানে সরকারের নানমুখী কল্যাণমূলক উদ্যোগের কারণে ঝরে পরা শিক্ষার্থীর সংখ্যা হ্রাস পাচ্ছে। আগে এসএসসি বা ইন্টারমিডিয়েটের পরে বা তারও আগে অনেকেই কোনো জীবিকা খুঁজে নিতো। বিশেষ করে দরিদ্র পরিবারের সন্তানদের ঝরে পরার হার বেশি ছিল। কারণ উচ্চশিক্ষায় লেখাপড়ার খরচ চালানোর মতো সামর্থ্য অনেকেরই ছিল না। আর মেয়েদের ক্ষেত্রে উচ্চশিক্ষা ছিল আরও প্রতিবন্ধক। যদি কেউ সাধারণ শিক্ষার দিকে না গিয়ে কারিগরী শিক্ষার দিকে যায় তাহলে কোনো বিষয়ে ডিপ্লোমা এবং পরে বিএসসি করছে।


এখন কারিগরি শিক্ষাকেই বেশি উৎসাহিত করা হচ্ছে। তার লক্ষও বেকার সমস্যা দূরিকরণ। চাকরি না পেলেও তার কারিগরি জ্ঞান কাজে লাগিয়ে নিজের সংস্থান নিজেই করতে পারছে। কিন্তু যারা সাধারণ শিক্ষায় উচ্চতর ডিগ্রী সম্পর্ণ করছে তাদের কি হবে? তাদের একমাত্র উপায় চাকরি খোঁজা। ক্ষেত্ত্রবিশেষে ব্যবসা করা। যদিও সবাই ব্যবসার চেয়ে চাকরিই অধিক পছন্দ করে। পরিস্থিতি এখন বহুগুনে বদলেছে। এখন বিনামূল্যে বই প্রদান,উপবৃত্তি, উপজেলা পর্যায়ে স্কুল ও কলেজ সরকারিকরণ, উপজেলা পর্যায়ে ডিগ্রীর পাশপাশি অনার্স করার সুযোগ রয়েছে। এসব কারণে লেখাপড়ার খরচও কমে এসেছে। নিজের এলাকায় থেকেই উচ্চ শিক্ষা সমাপ্ত করার সুযোগ পাচ্ছে তরুণরা। ফলে কেউ অল্প শিক্ষিত হয়েই লেখাপড়া ছেড়ে না দিয়ে বরং শেষ করতেই বেশি আগ্রহী। এসব সুযোগ সুবিধা আজ একটি দরিদ্র পরিবারের সন্তানকেও উচ্চ শিক্ষার স্বপ্ন দেখায়।


কিন্তু সেই স্বপ্ন কি? সংসারে সচ্ছলতা আনার স্বপ্ন। একটা চাকরি নিয়ে মা বাবার মুখে হাসি ফোটানোর স্বপ্ন। পিইসি,জেএসসি,এসএসসি শেষ করে উচ্চ মাধ্যমিক পড়তে যাওয়ার সময়ই তার চোখে থাকে আরও বড় কোন স্বপ্ন। সেই স্বপ্ন থাকে একটি চাকুরি বা তার চেয়েও বড় কোনো স্বপ্ন। ভবিষ্যতের সুন্দর কোন স্বপ্ন তাদের চোখের সামনে দোল খায়। সেই সাথে কোন পথে গেলে সেই স্বপ্ন বাস্তবায়িত হবে তার পরিকল্পনা করে। উচ্চতর ডিগ্রী নিয়ে ভালো কোন চাকরি করার চেষ্টা তার ভেতর লালিত হয়। এসব ছাড়াও দেশে উচ্চ শিক্ষা নেয়ার জন্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি বহুসংখ্যক প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে উঠেছে। যদিও তার অনেকগুলোরই মান নিয়ে নানা প্রশ্ন রয়েছে। নিজস্ব ক্যাম্পাসসহ অনেক শর্তই পূরণ করতে হিমশিম খাচ্ছে।

যাই হোক, উচ্চ শিক্ষা মানে উচ্চ স্বপ্ন। কিন` প্রশ্ন হলো আমাদের দেশে উচ্চশিক্ষা কি যুবকদের উচ্চস্বপ্ন পূরণ করতে সড়্গম হচ্ছে? লেখাপড়া শেষে একটি চাকরির নিশ্চয়তা দিতে পারছে? যদি না পারে তাহলে উচ্চ শিড়্গার মূল উদ্দেশ্য কি? বেকার সমস্যা আমাদের দেশের একটি বড় সমস্যা। একসময় বলা হতো, লেখাপড়া করে যে গাড়িঘোড়ায় চড়ে সে’। এ কথা আজকের সমাজে ধ্রুব সত্য নয়। যে লেখাপড়া করছে সেই কি গাড়িঘোড়া দূরে থাক কোনোমতে তিনবেলা খেয়েপড়ে বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা পাচ্ছে? শিক্ষিত বেকারের কষ্ট আরও বহুগুণে বেশি। লেখাপড়া শেষে চাকরি না যোগাড় করতে পারলে তার পরিবার এবং সমাজের কাছে হেয় হতে হয়।

চাকরি না পাওয়ার ব্যর্থতা মাথায় নিয়ে আত্নহত্যার ঘটনাও ঘটছে। অনার্স-মাষ্টার্স শেষ করার পর যখন একজন চাকরির বাজারে প্রতিযোগীতায় নামে তখন কতজন উচ্চ শিক্ষিত যুবক শেষ পর্যন্ত সফল হচ্ছে? উচ্চ শিক্ষা এখন আর কাজ পাওয়ার নিশ্চয়তা দিতে পারছে না। বরং উচ্চ শিক্ষা নিয়ে বেকার সমস্যা জটিল হচ্ছে না তো? আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) আঞ্চলিক কর্মসংস্থান নিয়ে এক প্রতিবেদনে বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষিত বেকারত্ব নিয়ে নানা তথ্য উঠে এসেছে।

এশিয়া প্যাসিফিক এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সোশাল আউটলুক-২০১৮ শীর্ষক এক প্রতিবেদন সম্প্রতি প্রকাশ করা হয়। সেই প্রতিবেদনে দেখা যায়, বাংলাদেশ দেড় যুগ আগে ২০০০ সালে সার্বিক বেকারত্বের হার ছিল ৩ দশমিক ৩ শতাংশ। ২০১০ সালে তা ৩ দশমিক ৪ শতাংশে দাড়ায়। বাংলাদেশে পুরুশদের ক্ষেত্রে বেকারত্ব ৩ দশমিক ৩ শতাংশ ও নারীর ড়্গেত্রে ১২ দশমিক ৮ শতাংশ। তরুণরা যত বেশি পড়ালেখা করছেন, তাদের তত বেশি বেকার থাকার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। সেখানে বলা হয়েছে, উচ্চশিক্ষিত বেকারত্বে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয়। সবচেয়ে বেশি পাকিস্থানে। বাংলাদেশে এ হার ১০ দশমিক ৮ শতাংশ। ছোটবেলা থেকেই বাবা মা’র স্বপ্ন থাকে সনত্মানকে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করার। এর প্রধান উদ্দেশ্য থাকে একটি চাকরি করে জীবনের নিশ্চয়তা আনার। কিন্তু লেখাপড়া শেষ করার পর দেখা যায় চাকরি খোঁজার জন্যই অবশিষ্ট রয়েছে চার-পাঁচ বছর।

চাকরিতে প্রবেশের বয়স বাড়ানোর জন্য বহু আন্দোলন হয়েছে। তবে তা বাস্তবায়িত হয়নি। এই চার-পাঁচ বছরের মধ্যে সে চাকরির বাজারে ঘুরতে ঘুরতে পায়ের তলা ড়্গয় করে। তবু চাকরি হয় না। সরকারি চাকরির চাহিদা এখন আকাশচুম্বী। প্রতি বছর এই সেক্টরে চাহিদা দ্বিগুণ হচ্ছে। সবার লক্ষ কোনোমতে একটা সরকারি চাকরি নেয়া। তা সে কোনো পদ হলেই হলো। এর জন্য মোটা টাকা উৎকোট দিতেও সমস্যা হচ্ছে না। কিন` যার সামর্থ্য নেই তার ক্ষেত্রে কি হবে? তার জন্য খোলা থাকলো বেসরকারি চাকরি। কিন` প্রাইভেট কোম্পানিতে অধিকাংশ সময়ই দেখা যায় অভিজ্ঞতা চেয়ে বসে আছে।

সদ্য পাশ করা একজন তরম্নণ অভিজ্ঞতার ঝুলি ভরবে কি দিয়ে? এর সাথে যোগ হয় সুপারিশের যন্ত্রণা! যার অভিজ্ঞতা এবং সুপারিশ নেই তার ড়্গেত্রে প্রতি পদক্ষেপে বিড়ম্বনা অপেক্ষা করে। এমন অনেকেই আছে যারা পড়ালেখা শেষ করার পর কয়েকটি বছর কেবল চাকরি খুঁজেই কাটিয়ে দেয়। তারপর চাকরির বয়স শেষ হলে কোনো কাজ বা ছোটখাটো ব্যবসা শুরম্ন করে। কিন` যতদিন চাকরি খোঁজার বয়স থাকে ততদিন সে চাকরি খুঁজতেই কাটিয়ে দেয়। সরকারি চাকরির সুযোগ খুব বেশি নেই। ফলে প্রধান ভরসা বেসরকারি খাত। কিন্তু সেই খাতেও নতুনদের আসতে নানা বাধা। ফলে উচ্চ শিক্ষিত হয়েও একজন তরুণ বেকার থাকছে।

উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে কেউ বেকার বসে থাকতে চায় না। কিন্তু বেকার থাকতে হয়। ক্রমেই শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। যারা তাদের মেধা দিয়ে দেশটাকে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে ভূমিকা রাখবে তারা কর্মহীন হয়ে ঘুরে বেড়ানো হতাশার। এসব শিক্ষিত বেকার যুবকদের কর্মমুখী করতে নানামুখী উদ্যোগ নেয়া হয়। এর মধ্যে অন্যতম হলো এই প্রজন্মকে প্রযুক্তিতে দড়্গ করে গড়ে তোলা। ফ্রিল্যান্সিংসহ প্রযুক্তিতে দক্ষ করে গড়ে তুলতে পারলে নিজের শিক্ষা কাজে লাগিয়ে নিজের ভবিষ্যত গড়ে নেয়া সম্ভব। শিক্ষিত এই প্রজন্মকে কাজের নিশ্চয়তা দিতে হবে। উন্নত দেশ গড়তে বেকার সমস্যা সমাধানের কোনো বিকল্প নেই।

অলোক আচার্য
শিক্ষক ও কলামিষ্ট

এডুকেশন বাংলা/একে

সব খবর
এই বিভাগের আরো খবর