বৃহস্পতিবার ১৭ অক্টোবর, ২০১৯ ৭:১১ এএম


ইউরোপে শেকৃবির তিন শিক্ষার্থীর স্বপ্ন জয়

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১৫:৫৫, ২ আগস্ট ২০১৯  

বর্তমান বিশ্বে উচ্চশিক্ষা অর্জনে অত্যন্ত আকর্ষণীয় ও সম্মানজনক স্কলারশিপের মধ্যে একটি ‘ইরাসমাস মুন্ডুস’ শিক্ষাবৃত্তি। ইউরোপে উচ্চ শিক্ষায় আগ্রহীদের প্রথম পছন্দ এই স্কলারশিপ।

বাংলাদেশ থেকে এ বছর ১০০টি প্রোগ্রামে ৭৮ জন এই স্কলারশিপ পেয়েছেন। এতে স্থান করে নিয়েছেন শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের তিন স্বপ্নবাজ— মো. নাসির হোসেন সানি, আবু বকর সিদ্দিক এবং রিমানা ফাতেমা।

মো. নাসির হোসেনের বাড়ি টাংগাইলের ঘাটাইলে। আবু বকর সিদ্দিকের জন্ম চুয়াডাঙ্গার আলমডাংগায় এবং ফেনির ছাগলনাইয়ার মেয়ে রিমানা ফাতেমা। ইউরোপে এ বৃত্তির অধীনে সানি পড়াশোনা করবেন ডেনমার্কের কোপেন হেগেন ইউনিভার্সিটি ও জার্মানির টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটি অব ডেজড্রেনে।

আবু বকর ও ফাতেমা পড়বেন সুইডেনের সুইডিশ ইউনিভার্সিটি অব এগ্রিকালচারাল সায়েন্স ও তুরস্কের এগি ইউনিভার্সিটিতে। তিনজনই ২ বছর মেয়াদে মাস্টার্স করবেন। প্রত্যেকেই পাবেন ৪৯ হাজার ইউরো শিক্ষাবৃত্তি।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন প্রদত্ত এ বৃত্তির অধীনে রয়েছে দারুণসব সুযোগ-সুবিধা। উচ্চতর গবেষণার পাশাপাশি এই স্কলারশিপের অন্যতম আকর্ষণ হচ্ছে— মাসিক স্কলারশিপের পরিমাণ, সম্পূর্ণ ভ্রমণভাতা, স্বাস্থ্যবিমা ও গবেষণা সম্পর্কিত সকল খরচ বহন।

তাছাড়া বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি থেকে শুরু করে সব ধরনের টিউশন ফি, লাইব্রেরি ফি, পরীক্ষা ফি, গবেষণাসংক্রান্ত ফিসহ বিভিন্ন ধরনের কনফারেন্স, ইন্টার্নি প্রভৃতি থাকছে একেবারে ফ্রি। এমনকি দেশভেদে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যান্টিনে সম্পূর্ণ বিনা খরচে খাবারের সুবিধাসহ শহরভেদে পাবলিক পরিবহনে নির্ধারিত ভাড়ার অর্ধেক খরচে চলাচলের সুবিধা, ইউরোপের বিমান চলাচলেও রয়েছে বিভিন্ন ধরনের প্রমোশন ব্যবস্থা।

একসময় শুধু মাস্টার্স করার সুযোগ থাকলেও এখন ব্যাচেলর ও পিএইচডি করার জন্যও রয়েছে দারুণসব সুযোগ।

মো. নাসির হোসেন সানি : মো. নাসির হোসেন সানি বলেন, ছোটবেলা থেকেই বিদেশে পড়ার স্বপ্ন থাকলেও বিশ্ববিদ্যালয়ে ২য় বর্ষের শেষে সিদ্ধান্ত নেই কৃষিক্ষেত্রে উচ্চশিক্ষা অর্জনে দেশের বাইরে যাবো। সে লক্ষ্যে প্রস্তুতি নিতে শুরু করি।

সিপিজিএ ৩.৮৩ পেয়ে স্নাতক শেষ করি। যখন দেখতাম বন্ধুরা বিভিন্ন চাকরির প্রস্তুতি নিচ্ছে আর আমি স্বপ্নের পিছনে ছুটছি তখন নিজের মধ্যে হতাশা কাজ করত।

তারপরও সিদ্ধান্তে অটল ছিলাম। আইইএলটিএসে স্কোর ৭ অর্জন করি। বিভিন্ন শিক্ষকদের সাথে গবেষণা কাজে যুক্ত হয়ে আন্তর্জাতিক জার্নালে ৬টি গবেষণাপত্র প্রকাশ করি।

২০১৮ সাল থেকে বিভিন্ন দেশে বৃত্তির জন্য আবেদন শুরু করি। ইউরোপের ১০টি প্রোগ্রামে আবেদন করার পর ৭টিতে ভর্তির সুযোগ এবং ২টিতে স্কলারশিপ পাই। বেছে নেই ইরাসমাস মুন্ডুসকে। সেদিনের সাহসী সিদ্ধান্তেই আজ যাচ্ছি স্বপ্নের ইউনিভার্সিটিতে।

আবু বকর সিদ্দিক : আবু বকর সিদ্দিক বলেন, কৃষক পরিবারে জন্ম আমার। ছোটকাল থেকেই দারিদ্র্যের সাথে যুদ্ধ করে বড় হয়েছি। প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে প্রাইমারি ও মাধ্যমিক পড়া শেষ করে শহরে পড়া একসময় স্বপ্ন ছিল।

সে অবস্থা থেকে বিদেশে পড়তে যাওয়া মরীচীকার মতো মনে হতো। তবুও স্বপ্ন দেখে গেছি। মামার সহায়তায় কলেজ শেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিলাম। বিশ্ববিদ্যালয়ে সারা বছর টিউশনি করাতাম। ৩.৮৯ সিজিপিএ নিয়ে অনার্স শেষ করেছি।

একইসাথে আইইএলটিএস, জিআরই, মাস্টার্স ও গবেষণা কাজে যুক্ত থাকা খুব কষ্টকর ছিল। স্কলারশিপের আবেদনের জন্য মাত্র ২ মাস সময় পেয়েছিলাম। মাত্র ২টি স্কলারশিপে আবেদন করতে পেরেছিলাম।

এত কম সময়ের মধ্যে ইরাসমাস মুন্ডুস স্কলারশিপ পাই। পরিশ্রম ও সৌভাগ্য আমাকে সফলতা এনে দিয়েছে। মা-বাবার অনুপ্রেরণা, গবেষণার সুপারভাইজারসহ বিভাগের অন্যান্য শিক্ষক ও সিনিয়রদের সহযোগিতা আমাকে এ পর্যন্ত নিয়ে এসেছে।

রিমানা ফাতেমা : রিমানা ফাতেমা বলেন, কলেজে জীববিজ্ঞান বইয়ের জেনেটিক্স, জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং, বায়োটেকনোলজি শব্দগুলো আমাকে উচ্চশিক্ষা অর্জনে স্বপ্ন দেখিয়েছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির শুরু থেকেই বিদেশে উচ্চশিক্ষার তথ্য জানার চেষ্টা করতাম।

সিজিপিএ ৩.৮২ নিয়ে অনার্স শেষ করার পর বন্ধুদের ‘বিসিএস ছাড়া গতি নাই’ কথাটি খুব হতাশ করত। সেসময় বাবার চাকরি জীবনের সংগ্রাম আমাকে শিখেয়েছে হার না মানতে।

মায়ের চোখে আমার সফলতার স্বপ্ন আমাকে অনুপ্রেরণা এবং স্বামীর সহযোগিতা নিজের মাঝে বিশ্বাস জাগাতো। নিরবচ্ছিন্ন ইচ্ছা, পরিবারের উৎসাহ আর চেষ্টায় বিধাতা আমাকে লক্ষ্যে পৌঁছে দিয়েছে।

স্কলারশিপ পেতে পরামর্শ : বিশ্ববিদ্যালয়ে একাডেমিক রেজাল্ট ভালো করার পাশাপাশি বিদেশে উচ্চ শিক্ষার প্রস্তুতি নিতে হবে। এজন্য সবচেয়ে কাছের বন্ধু গুগল। বিদেশে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্য নিতে হবে। ভাষাগত দক্ষতা অর্জন খুব জরুরি। বিভিন্ন সহশিক্ষা কার্যক্রমে অংশগ্রহণ খুব কাজে দেবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো মোটিভেশনাল লেটার। এটি আপনার যোগ্যতাকে তুলে ধরবে।

এজন্য ইন্টারনেট অথবা অভিজ্ঞদের থেকে পরামর্শ নিতে পারেন। সময় নিয়ে দক্ষতার সাথে লেটার লিখতে হবে। বিভিন্ন গবেষণাকাজে অভিজ্ঞতা ও প্রকাশনা স্কলারশিপ অর্জনে আপনাকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাবে। একটু সাহস, ধৈর্য্য আর একটি সিদ্ধান্ত আপনাকে করবে আপনার স্বপ্নের সমান বড়।


এডুকেশন বাংলা/এজেড

সব খবর
এই বিভাগের আরো খবর