মঙ্গলবার ২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ৩:০৪ এএম


ইউজিসির ‘ক্যাট’ প্রস্তাব: তিন পরীক্ষায় ভর্তি সব বিশ্ববিদ্যালয়ে

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ০৯:২৯, ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২০  

আলাদা তিন পরীক্ষার মাধ্যমে দেশের সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ভর্তি করা হবে। শিক্ষক প্রতিনিধির সমন্বয়ে গঠিত কেন্দ্রীয় কমিটি এ পরীক্ষা নেবে। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) পুরো বিষয়টি তত্ত্বাবধান করবে।

পরীক্ষায় প্রাপ্ত নম্বরের ভিত্তিতে ছাত্রছাত্রীরা ভর্তি হবে। তবে ভর্তির ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের পছন্দের বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিভাগের আরোপিত শর্ত পূরণ করতে হবে। ইউজিসির কেন্দ্রীয় পরীক্ষা ব্যবস্থা চালু সংক্রান্ত প্রস্তাবে এসব উল্লেখ করা হয়েছে। প্রস্তাবটি বৃহস্পতিবার সব বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠানো হয়।

ইউজিসির চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. কাজী শহীদুল্লাহ যুগান্তরকে বলেন, নতুন ব্যবস্থায় ভর্তি পরীক্ষার ব্যাপারে একটি প্রস্তাব আমরা তৈরি করেছি। এটির ওপর আরও আলোচনা শেষে চূড়ান্ত হবে। এটা চালু হলে শিক্ষার্থীদের আর ২০-২৫টি পরীক্ষা দিতে হবে না, একটি দিয়েই ভর্তি হতে পারবে।

ইউজিসির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পরীক্ষাটির প্রস্তাবিত নাম ‘সেন্ট্রাল অ্যাডমিশন টেস্ট’ (সিএটি-ক্যাট)। এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর এ পরীক্ষার আয়োজন করা হবে। এতে শিক্ষার্থীরা একটি স্কোর পাবে। সেটি নিয়ে তারা যাবে পছন্দের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য। এ পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীকে মোট দু’বার আবেদন করতে হবে। প্রথমবার ক্যাটের স্কোর পাওয়ার জন্য, দ্বিতীয়বার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তির জন্য। উভয় আবেদনই নেয়া হবে অনলাইনে। শূন্য থেকে ১০০ পর্যন্ত হবে স্কোরের সীমা। এখন পর্যন্ত পরীক্ষার জন্য একাধিক প্রশ্নপদ্ধতির প্রস্তাব আছে।

কেউ ৫০ নম্বর লিখিত ও ৫০ নম্বর বহু নির্বাচনী প্রশ্নের কথা বলছেন। কেউ ৫০ নম্বরের এমসিকিউয়ের সঙ্গে ছোট প্রশ্নের কথা বলছেন। আবার শতভাগ এমসিকিউ প্রশ্নের প্রস্তাবও আছে। তবে কোন প্রক্রিয়া গ্রহণ করা হবে তা আগামী ২৬ ফেব্রুয়ারির পরবর্তী বৈঠকে চূড়ান্ত হতে পারে বলে জানা গেছে।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পাঠানো ইউজিসির প্রস্তাবে বলা হয়েছে, স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখে এর আগে যেভাবে ১ম বর্ষ স্নাতক সম্মান শ্রেণিতে শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়েছে, একইভাবে ২০২০-২০২১ শিক্ষাবর্ষ থেকে কেন্দ্রীয় ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। এইচএসসিতে পঠিত বিষয়গুলোর ভিত্তিতেই পরীক্ষা হবে। বিষয়টি বিবেচনায় রেখে উচ্চ মাধ্যমিক ফল প্রকাশের পর কেন্দ্রীয় ভর্তি কমিটি নির্ধারিত সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিজ নিজ ক্যাম্পাসে ভর্তি পরীক্ষার আয়োজন করবে।

অভিজ্ঞ এবং সিনিয়র শিক্ষকদের নিয়ে কলা, বিজ্ঞান ও বিজনেস স্টাডিজ শাখার জন্য আলাদা তিনটি কেন্দ্রীয় ভর্তি পরীক্ষা কমিটি গঠন করা হবে। তিন শাখায় তিন দিন আলাদা ভর্তি পরীক্ষা হবে।

এতে ফল প্রকাশের পর কেন্দ্রীয় ভর্তি কমিটির কাজ শেষ হবে। পরে প্রত্যেক বিশ্ববিদ্যালয় প্রচলিত পদ্ধতিতে (কিংবা যেভাবে তারা উপযুক্ত মনে করেন) তাদের নিজ নিজ প্রয়োজনীয় শর্তাবলি সংযোজন করে আলাদা বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করবে। নতুন করে আর পরীক্ষা না নিয়ে কেন্দ্রীয় ভর্তি পরীক্ষায় প্রাপ্ত স্কোরকে বিবেচনা করেই ছাত্রছাত্রী ভর্তি করবে।

খসড়া প্রস্তাবে আরও বলা হয়, প্রত্যেক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়েই ভর্তি পরীক্ষার কেন্দ্র থাকবে। ছাত্রছাত্রীরা তাদের পছন্দ অনুযায়ী অভিন্ন প্রশ্নে পছন্দকৃত বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রে পরীক্ষা দেবে। কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে যদি তাদের পরীক্ষা নেয়ার সামর্থ্যরে অতিরিক্ত আবেদন পাওয়া যায়, সেক্ষেত্রে মেধাক্রম অনুযায়ী নিকটতম বিশ্ববিদ্যালয়ে তার পরীক্ষা নেয়ার ব্যবস্থা করা হবে।

প্রস্তাব অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আগের মতোই ভর্তির জন্য প্রয়োজনীয় শর্তারোপ করার সুযোগ পাবে, যা নিজ নিজ একাডেমিক কাউন্সিল বা ভর্তি কমিটি নির্ধারণ করে থাকে।

তবে বিশেষায়িত বিভাগগুলো যেমন- স্থাপত্য, চারুকলা ও সঙ্গীত বিভাগগুলো প্রয়োজনমতো শুধু ব্যবহারিক পরীক্ষা নিতে পারবে। তবে সেক্ষেত্রেও কেন্দ্রীয় ভর্তি পরীক্ষার স্কোর সংযুক্ত করেই ভর্তির জন্য মেধাতালিকা তৈরি করতে পারবে।

দেশে বর্তমানে ৪৬ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় আছে। এগুলোর মধ্যে ৩৯টিতে প্রথম বর্ষে শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়। বর্তমানে প্রচলিত পদ্ধতিতে প্রত্যেক বিশ্ববিদ্যালয় আলাদা ভর্তি পরীক্ষার আয়োজন করে। এতে শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক ভোগান্তিতে পড়তে হয়। বিপুল অঙ্কের আর্থিক ব্যয়ের মুখেও পড়ে তারা। এসব নিরসনের জন্য কেন্দ্রীয় ভর্তি পরীক্ষা পদ্ধতি গ্রহণের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।

তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ইউজিসির উল্লিখিত প্রস্তাব অনুযায়ী কেবল পরীক্ষার ঝক্কি কমবে। কিন্তু শিক্ষার্থীদের বিশ্ববিদ্যালয় আর বিভাগে বিভাগে দৌড়ানো বন্ধ হবে না। কেননা প্রাপ্ত স্কোর নিয়ে শিক্ষার্থীকে আবার বিশ্ববিদ্যালয়েই যেতে হবে। এ ক্ষেত্রে প্রাপ্ত স্কোরে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স না হলে আরেক বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতে হবে।

আবার বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক আবেদন করতে ফের ফি দিতে হবে কিনা সেটাও প্রস্তাবে বলা হয়নি। যদি ফি দিতেই হয় তাহলে একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদনের জন্য একাধিকবারই ফি দিতে হচ্ছে। ফলে শিক্ষার্থীদের আগের মতোই আর্থিক দণ্ডের মুখে পড়তে হচ্ছে।

প্রস্তাবে স্বচ্ছতা নিশ্চিতের কোনো পন্থাও নির্দেশ করা হয়নি। অর্থাৎ কেন্দ্রীয় স্কোরের ভিত্তিতে ভর্তির ব্যবস্থা করা হলেও কোনো বিশ্ববিদ্যালয় যদি মেধাক্রম অনুসরণ না করে সে ক্ষেত্রে বঞ্চনা রোধের ব্যবস্থা কী হবে সেটা উল্লেখ করা হয়নি। অবশ্য ইউজিসি কর্মকর্তারা বলছেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কেন্দ্রীয় পরীক্ষার কোন স্কোরের মধ্য থেকে শিক্ষার্থী ভর্তি করবে সেটা আগাম ঘোষণা দেবে। ওই স্কোরের কম প্রাপ্তরা আবেদনই করতে পারবে না সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, তবে উল্লিখিত পদ্ধতির তুলনায় মেডিকেল কলেজে এমবিবিএস এবং বিসিএসে প্রার্থীর পছন্দের ক্রম অনুযায়ী ক্যাডার বরাদ্দের ব্যবস্থা অনেকটাই ঝক্কিমুক্ত হতে পারত। মেডিকেলে বিদ্যমান অবস্থা অনুযায়ী, শিক্ষার্থীর মেধাক্রম এবং কলেজ পছন্দক্রম অনুযায়ী কলেজ বরাদ্দ করা হয়। অর্থাৎ পছন্দক্রম অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানের আসন শূন্য থাকা সাপেক্ষে শিক্ষার্থীর মেধাক্রম অনুযায়ী প্রতিষ্ঠান বরাদ্দ করা হয় এমবিবিএসে। বিসিএসে ক্যাডার বরাদ্দের প্রক্রিয়াও এমনটি।

এ বছর থকেই সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা চালুর দাবি সংসদে : শিক্ষার্থীদের সুবিধার্থে চলতি বছর থেকে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে ভর্তির সুযোগ দিতে আহ্বান জানিয়েছেন বিএনপি দলীয় সংসদ সদস্য হারুনুর রশীদ। তিনি বলেছেন, বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ যুগোপযোগী করা দরকার। বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে পয়েন্ট অব অর্ডারে এ কথা বলেন তিনি।

হারুনুর রশীদ বলেন, ‘উচ্চ শিক্ষাপ্রত্যাশী শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবক সবাই চাইছেন সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে ভর্তির সুযোগ। তাই এ বছর থেকে আমাদের ছাত্রছাত্রীরা যেন সমন্বিত কার্যক্রমের মাধ্যমে ভর্তির সুযোগ পায়, সরকার সেই বিষয়টি দেখবে। এজন্য তিনি স্পিকারের রুলিংও দাবি করেন।

এডুকেশন বাংলা/ এজেড

সব খবর
এই বিভাগের আরো খবর