বৃহস্পতিবার ২৩ জানুয়ারি, ২০২০ ১৭:৫২ পিএম


আয়-ব্যয় নীতিমালায় বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কমিটিতে যারা অযোগ্য

সাব্বির নেওয়াজ

প্রকাশিত: ০৯:২৯, ৪ ডিসেম্বর ২০১৯   আপডেট: ১৩:৩৪, ৪ ডিসেম্বর ২০১৯

বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের (স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান) তহবিল তছরুপের অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্নিষ্টরা পরবর্তী সময়ে কমিটিতে থাকার অযোগ্য হবেন। ওই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অথবা অন্য কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কমিটিতেও থাকতে পারবেন না তারা। এমন বিধান রেখে `বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রীদের কাছ থেকে আদায় করা অর্থের আয়-ব্যয়ের নীতিমালা-২০১৯` তৈরি করতে যাচ্ছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এতে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অর্থ ব্যয়ের স্বচ্ছতা আনতে নতুন নতুন বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অর্থ ব্যয়ের বিষয়ে ২০১৪ সালে একটি নীতিমালা জারি করা হয়েছিল। এরই মধ্যে পাঁচ বছর অতিক্রান্ত হওয়ায় এ নীতিমালা যুগোপযোগী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সূত্রগুলো জানায়, সাম্প্রতিক সময়ে মন্ত্রণালয়ে সবচেয়ে বেশি অভিযোগ আসে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নিয়ে। ২০১৬ সাল থেকে শিক্ষক নিয়োগ সরকারি উদ্যোগে কেন্দ্রীয়ভাবে হওয়ায় নিয়োগ নিয়ে দুর্নীতির অভিযোগ এখন কমেছে। এখন কমিটির সদস্যদের আর্থিক দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগই সবচেয়ে বেশি আসছে। এর মধ্যে বড় ও পুরনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো থেকে আসা আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগই বেশি। এ কারণে এই নীতিমালা হালনাগাদ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

সূত্র জানায়, সরকারি কোনো তদন্তে অর্থ আত্মসাৎকারী অথবা তছরুপকারী হিসেবে প্রমাণিত হলে শিক্ষা বোর্ড থেকে সংশ্নিষ্টদের আদেশ জারি করে কমিটি থেকে বাদ দেওয়া হবে। অনিয়মকারী কোনো শিক্ষক হলে তিনি চাকরিচ্যুত হবেন। আর আত্মসাতের ঘটনা হলে ফৌজদারি মামলাও দায়ের করা হবে সংশ্নিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে।

নীতিমালা তৈরির কাজটি তদারকি করছেন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (বেসরকারি মাধ্যমিক) জাবেদ আহমেদ। তিনি বলেন, `নীতিমালা তৈরির কাজ চলছে। নীতিমালা জারি হলে বিস্তারিত জানতে পারবেন। আমরা চাই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো ভালোভাবে আর্থিক স্বচ্ছতার সঙ্গে পরিচালিত হোক। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো হবে শিক্ষার জন্য উর্বর ক্ষেত্র। সেখানে আর্থিক অনিয়ম কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।`

জানা গেছে, এ নীতিমালা তৈরি করতে পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির আহ্বায়ক শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব (নিরীক্ষা)। বাকিরা হলেন- মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) প্রতিনিধি, ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের প্রতিনিধি, মাউশির ঢাকা অঞ্চলের আঞ্চলিক উপপরিচালক ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপসচিব (বিধিবদ্ধ নিরীক্ষা)।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্রমতে, আর্থিক ব্যয়ের ক্ষেত্রে বেশিরভাগ বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই কোনো স্বচ্ছতা নেই। রাজধানীর চানখাঁরপুল এলাকার খ্যাতনামা একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কমিটি সম্প্রতি ২২ কোটি ব্যয় করে প্রতিষ্ঠানের জমি কিনেছে। এ ব্যয় অত্যধিক বলে মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের কাছে মনে হয়েছে। এ ছাড়া এই মুহূর্তে নতুন ক্যাম্পাস প্রতিষ্ঠা করা ওই প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয় নয় বলেও খোদ শিক্ষকরাই মন্ত্রণালয়ে অভিযোগ দায়ের করেছেন। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিষ্ঠান `পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর` (ডিআইএ)-এর কর্মকর্তারা মাঠ পর্যায়ে পরিদর্শনে গিয়ে দেখতে পান, দেশের বহু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আয়-ব্যয়ের ক্ষেত্রে `ক্যাশ বই` ব্যবহার করে না। অনেক প্রতিষ্ঠান বিপুল অঙ্কের টাকা `নগদ` হিসেবে হাতে রেখে দেয়। বিভিন্ন ছোটখাটো কেনাকাটার কোনো ভাউচার সংরক্ষণ করা হয় না। অথচ এভাবে বছরজুড়ে মোটা টাকা ব্যয় করা হয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন প্রচারের বিল থেকে সরকারি ভ্যাট কেটে রাখা হয় না। অননুমোদিত ছুটি ভোগের পরও সে সময়গুলোতে সংশ্নিষ্ট শিক্ষককে বেতন দেওয়া হয়। বড় ধরনের নির্মাণ ও কেনাকাটায় দরপত্র আহ্বান ছাড়াই পছন্দের কোনো ঠিকাদারকে কাজ দেওয়া হয়। অথচ ৫০ হাজার টাকার নিচে কোটেশন আহ্বান ও পাঁচ লাখ টাকার নিচে পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে দরপত্র আহ্বান করার বিধান রয়েছে। আর্থিক ব্যয়ের ক্ষেত্রে আরও নানা ধরনের অনিয়ম লক্ষ্য করা যায়। যেমন একই অধ্যক্ষ একই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের একাধিক শাখা থেকে ভাতা তুলছেন। নিজ প্রতিষ্ঠানেরই আরেক শাখা পরিদর্শনের নামে পরিদর্শন ভাতা উত্তোলন করছেন। প্রতিষ্ঠানের তৈরি করা বাসভবনে বসবাস করেও প্রতিষ্ঠানপ্রধান বাড়ি ভাড়ার পুরো টাকা বেতনের সঙ্গে তুলছেন। ইংরেজি মাধ্যম স্কুলগুলোর দু-একটির বিরুদ্ধে দেশের বাইরে অর্থ পাচার (মানি লন্ডারিং) করার অভিযোগও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জমা হয়েছে।

মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা জানান, ব্যয়ের মতো আয়ের ক্ষেত্রেও নূ্যনতম স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নেই অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। প্রতিষ্ঠানে বিশেষ ক্লাস অথবা কোচিংয়ের নামে নেওয়া ফির ক্ষেত্রে কোনো মানি রিসিট অভিভাবকদের দেওয়া হয় না। বিদ্যালয়ের বিবিধ আয় যেমন- দোকান ভাড়া, ক্যান্টিন ভাড়া, ছাত্র হোস্টেলের আয়, পুকুরের মাছ বিক্রি, গাছ বিক্রি, মেলা বা অন্য কোনো কারণে মাঠ ভাড়া দেওয়ার টাকা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আয়ে না দেখিয়ে তা ভাগ-বাটোয়ারা করে নেন কমিটির লোকেরা। সরকারি বিভিন্ন নিয়োগ পরীক্ষার ভেন্যু হিসেবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ক্যাম্পাস ভাড়া দিয়ে আয় করা অর্থও ভাগ করে নেন প্রতিষ্ঠানপ্রধান ও শিক্ষকরা। এ ছাড়া বছরের যখন-তখন টিউশন ফি ও পরীক্ষার ফি বাড়িয়ে দেওয়া হয়। এতে অভিভাবকরা বিপাকে পড়েন।

নতুন নীতিমালা তৈরির বিষয়টিকে স্বাগত জানিয়েছেন অভিভাবকরা। অভিভাবক ঐক্য ফোরামের সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউল কবির দুলু বলেন, `এ ধরনের একটি নীতিমালা তৈরি করা আরও আগেই দরকার ছিল। আমরাও বিভিন্ন সময় দাবি করে আসছি যে, গভর্নিং বডি ও ম্যানেজিং কমিটিতে যারা থাকেন, তাদের সম্পদের হিসাব নিতে হবে। খ্যাতনামা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে লাখ লাখ টাকা খরচ করে যারা এসব কমিটির নির্বাচন করেন, রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে চেয়ারম্যান বা সদস্য হন, তারা তো শিক্ষানুরাগী ব্যক্তি নন, ব্যবসা করতে আসেন। তাদের অবশ্যই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে বের করে দিতে হবে।` তিনি বলেন, আর শুধু কমিটিতে না রাখাই সমাধান নয়, ফৌজদারি মামলা করে শাস্তি দেওয়া ও আত্মসাৎকৃত টাকাও এ ধরনের লোকদের থেকে উদ্ধার করে প্রতিষ্ঠানের ফান্ডে জমা দিতে হবে।

সূত্র: সমকাল
এডুকেশন বাংলা/এজেড

সব খবর
এই বিভাগের আরো খবর