শুক্রবার ১৯ জুলাই, ২০১৯ ২২:১৩ পিএম


আমেরিকার শিক্ষাব্যবস্থার শিক্ষা

কাজী ফারুক আহমেদ

প্রকাশিত: ০৯:৩৫, ৪ জুলাই ২০১৯  

আজ থেকে ২৪৩ বছর আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা ঘোষিত হয়েছিল। এ উপলক্ষে বাংলাদেশের শিক্ষক সমাজ যুক্তরাষ্ট্রের শিক্ষক ও জনগণের প্রতি অভিনন্দন জানিয়েছে।

বাংলাদেশের শিক্ষকদের পক্ষ থেকে আমেরিকান শিক্ষক ফেডারেশনের (এএফটি) সভাপতি র‌্যান্ডি ওয়েনগার্টেন বরাবর প্রেরিত অভিনন্দন বার্তায় বলা হয়েছে, ‘পেশাগত মর্যাদা ও শিক্ষার মানোন্নয়নের লক্ষ্যে বাংলাদেশের বিভিন্ন স্তরের ১০ লাখ শিক্ষক গুণগত শিক্ষালাভের অধিকার, মানবিক মর্যাদা, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পক্ষে, সংকীর্ণতা ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে আমেরিকান শিক্ষক, ভাইবোনসহ আন্তর্জাতিক শিক্ষক সম্প্রদায়ের সঙ্গে অভিন্ন অবস্থান থেকে একযোগে কাজ করার দৃঢ় প্রত্যয় পুনর্ব্যক্ত করছে।’

এএফটি সম্পাদক ও কোষাধ্যক্ষ লরেটা জনসন, কার্যকরী সভাপতি মেরি ক্যাথরিন রিকার ও আন্তর্জাতিক সহযোগী কর্মকর্তা এরিক ডান্কানকে পত্রের অনুলিপি প্রদান করা হয়েছে।

বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানুষের কাছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র স্বপ্ন, সম্ভাবনা ও প্রাচুর্যের দেশ। সেদেশের গবেষণা-প্রযুক্তিতে অগ্রাধিকার, উচ্চশিক্ষায় অর্জনের কথা অনেকেরই মুখে মুখে। কিন্তু উচ্চশিক্ষা-পূর্ববর্তী শিক্ষাব্যবস্থা ও কর্মরত শিক্ষকদের অনেক কিছু আমাদের সেভাবে জানা নেই।

ঠিক এ বিষয়গুলোর ওপর স্বপ্ন ও বাস্তবতা দুটোরই প্রসঙ্গ উঠে এসেছে আমেরিকান ফেডারেশন অব টিচার্সের সভাপতির বক্তব্যে। গত এপ্রিলে ওয়াশিংটনে জাতীয় প্রেস ক্লাবে প্রদত্ত তার এ বক্তব্য বিশ্বের শিক্ষক সমাজ ও শিক্ষানুরাগী মানুষের দৃষ্টি কেড়েছে।

এতে পেশাগত নানা সমস্যা ও সংকটের নির্দিষ্ট উল্লেখ যেমন আছে, একইসঙ্গে শিক্ষকতা পেশার আদর্শও সেখানে নির্ভুলভাবে উঠে এসেছে। ওয়াশিংটনে জাতীয় প্রেস ক্লাবে ‘আমাদের অবস্থান, শিক্ষকতা পেশায় সংকট’ শিরোনামে উপস্থাপিত তার কথাগুলো এখন উন্নত, উন্নয়নশীল, অনুন্নত বিভিন্ন দেশে আলোচিত হচ্ছে।

একজন ব্যক্তি শিক্ষকতা পেশাকে কেন বেছে নেন? শিক্ষকদের জবানিতে এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘শিক্ষকতায় যোগদানের কারণ আমি বিশ্বকে বদলে দিতে চাই। একজন একজন করে শিশু শিক্ষার্থীকে জ্ঞানের জগতে নিয়ে আসার মধ্য দিয়ে তা করতে চাই।

আমি পরবর্তী প্রজন্মকে এমনভাবে শিক্ষাদান করতে চাই, যাতে তারা সবকিছু নিয়ে জিজ্ঞাসা করতে পারে। সেজন্য শ্রেণিকক্ষ হতে হবে এমন যেখানে শিশুরা মন খুলে সব বলতে পারে। আমি শিক্ষকতায় আগ্রহী এজন্য যে, ভবিষ্যতের নাগরিকদের মধ্যে সমালোচনামূলক বিশ্লেষণের দক্ষতা অর্জিত না হলে ভবিষ্যতে আমাদের গণতন্ত্র টিকে থাকবে না।’

শিক্ষকতায় যোগদানেচ্ছু মার্কিন নবীনের উচ্চাকাঙ্ক্ষী এ ভাবনার সঙ্গে তার প্রত্যাশারও উল্লেখ রয়েছে এএফটি সভাপতি র‌্যান্ডি ওয়েনগার্টেনের সংবাদ সম্মেলনে প্রদত্ত বক্তব্যে। সেখানে তিনি বলেন, ‘শিক্ষক চান তার কাজের গুরুত্ব স্বীকৃতি পাক।

যেমন অভিভাবক ও জনগণ চান।’ প্রথমে তিনি তার বক্তব্য তুলে ধরেন আদর্শ হিসেবে বিবেচ্য এসব কথা, এরপর তিনি মার্কিন শিক্ষাব্যবস্থায় বর্তমানে বিরাজিত বিভিন্ন অসঙ্গতির কথা তুলে ধরতে ভোলেননি।

যার মধ্যে রয়েছে গণশিক্ষায় অর্থায়নে অনুদারতা এবং শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিতদের প্রতি বঞ্চনা, সমযোগ্যতার অধিকারী অন্যান্য পেশার সঙ্গে বৈষম্য ও শিক্ষায় কাঙ্ক্ষিত বরাদ্দের ক্ষেত্রে স্থানীয় ও জাতীয় ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের সীমাহীন নিস্পৃহতার কথা।

শিক্ষায় বর্তমান সংকটের কথা বলতে গিয়ে র‌্যান্ডি বলেন, পাবলিক স্কুলে কর্মরত শিক্ষক ও অন্যদের পেশা ত্যাগে সর্বোচ্চ রেকর্ড তৈরি হয়েছে। গত শিক্ষাবর্ষে শিক্ষকস্বল্পতা ছিল ১ লাখ ১০ হাজারের অধিক, যা ২০১৫ সালের দ্বিগুণ।

দেশের ৫০ রাজ্যের সবক’টিতে শিক্ষক স্বল্পতাজনিত সংকট দিয়ে গত শিক্ষাবর্ষ শুরু হয়েছে। যথোপযুক্ত প্রশিক্ষক ছাড়াই সারা দেশের এক লক্ষাধিক শ্রেণীকক্ষ পরিচালিত হচ্ছে। ... শিক্ষকতা পেশা এখন এমন অবমূল্যায়িত যে, গত পঞ্চাশ বছরের মধ্য এবারই অভিভাবকদের অনেকে বলছেন, তারা চান না তাদের সন্তানরা শিক্ষকতায় আসুক।’

আমি মার্চ থেকে জুন মাসের অর্ধেক সময় যুক্তরাষ্ট্রে ছিলাম। সেখানে দুটি ঘটনা সে সময় প্রাধান্য পায়। একটি হল, অভিবাসী শিক্ষার্থীদের প্রতি বিরূপ মন্তব্যকারী জর্জিয়া ক্লার্ক নামের এক নারী শিক্ষকের কর্মচ্যুতি। এ শিক্ষক টুইট করে অবৈধ অভিবাসী শিক্ষার্থী অপসারণে।

এমনকি ডোনাল্ড ট্রাম্পের সহায়তা চাইলেও তা কোনো কাজে আসেনি। বরং রিপাবলিকান, ডেমোক্র্যাট সব অভিভাবক একত্র হয়ে তার অপসারণে নেমে পড়েন। তারা একবাক্যে বলেন, শিক্ষকের কাজ প্রতিষ্ঠানে ভর্তিকৃত শিক্ষার্থীকে পড়ানো।

সে নাগরিক, না অবৈধ অভিবাসী তা দেখার দায়িত্ব কেউ তাকে দেয়নি। অন্য ঘটনাটি হল, টেক্সাস ও কালিফোর্নিয়ার শিক্ষকরা অন্য রাজ্যের তুলনায় বেতন-ভাতা কম পাওয়ার বিরুদ্ধে মাসব্যাপী যে আন্দোলন গড়ে তোলেন তার সফল পরিসমাপ্তি ঘটে। তাদের দাবি মেনে নেয়া হয়।

উল্লেখ্য, ইতিপূর্বে কর্তৃপক্ষ দাবি করে আসছিল, কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় অর্থায়ন সত্ত্বেও এ দুটি রাজ্যে শিক্ষার মানের অবনতি ঘটছে।

দেশে ফেরার আগে এএফটির কর্মকর্তা এরিক ডানকানের সঙ্গে আমার ফোনে কথা হয়। নানা সংকটের মধ্যেও তিনি তার আশাবাদের কথা বলেন। সংকট স্থায়ী হবে না বলে তিনি মার্কিন ব্যবস্থার সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করেন। আমেরিকার স্বাধীনতা দিবসে অনেকের মতো আমিও তার আশাবাদে আস্থা রাখতে চাই।

অধ্যক্ষ কাজী ফারুক আহমেদ : শিক্ষা ও শিক্ষক আন্দোলনের প্রবীণ নেতা

[email protected]

এডুকেশন বাংলা/এজেড

সব খবর
এই বিভাগের আরো খবর