মঙ্গলবার ১৫ অক্টোবর, ২০১৯ ৭:০১ এএম


আমি নিজে ছাপোষা শিক্ষক বলে...

গোলাম ফারুক

প্রকাশিত: ১১:৫৯, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯  

বহুদিন আগে একটা গল্প পড়েছিলাম। আমি নিজে ছাপোষা শিক্ষক বলে শিক্ষক-সম্পর্কিত ঘটনাটা ঠিকই মনে আছে। কোনো এক অজপাড়াগাঁয়ে এক হতভাগা শিক্ষক ছাত্র পড়ানোর কাজ পেলেন। ছাত্রদের বাগানের লাউটা-মুলাটা ছাড়াও পারিতোষিক হিসেবে সামান্য কিছু অর্থপ্রাপ্তি হতো বলে কষ্টেসৃষ্টে তাঁর দিন চলে যেত। এই স্বল্প বেতনটুকুও যে তিনি নিয়মিত পেতেন তা নয়, তবু ঘাড় গুঁজে নিষ্ঠার সঙ্গে তিনি তাঁর কাজ করে যাচ্ছিলেন।

কয়েক মাস ওঁর গোবেচারা স্বভাব লক্ষ করে গ্রামের বুদ্ধিমান মাতব্বরটির মনে হলো যে বেতন না দিয়েও তো ওঁকে দিয়ে বেগার খাটানো যায়। বেতন বন্ধ হলো। মাতব্বরটি যা ভেবেছিলেন তা-ই। তিনি প্রতিবাদ করেন না, যানও না। পেটেভাতে থাকেন আর ছাত্র পড়ান। এর বেশ কিছুদিন পর, বলা নেই কওয়া নেই, বাক্স-পেটরা নিয়ে একদিন তিনি হঠাৎ উধাও। তাতে যে কোনো ক্ষতি বৃদ্ধি হলো, তা নয়। চতুর মাতব্বর কয়েক দিনের মাথায় আরেকজন শিক্ষক জোগাড় করে ফেললেন। কিন্তু মাথায় হাত পড়ল সেদিন, যেদিন নতুন শিক্ষক দেখলেন, ছেলেমেয়েরা সব বর্ণমালা উল্টো করে লেখে। ওদের এভাবেই শেখানো হয়েছে; পুরোনো গোবেচারা শিক্ষকটি এভাবেই বেগার খাটানোর প্রতিশোধ নিয়ে গেছেন।

বেচারা শিক্ষকের প্রসঙ্গ আপাতত থাক। তার আগে ১৯৭০ দশকের সমাজতত্ত্ববিদ ওয়ালরস্টাইনের চোখ দিয়ে গোটা শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে অর্থনীতির সম্পর্কটা একটু ঝালিয়ে নিই। ওয়ালরস্টাইন বলেছেন, পৃথিবী তিন ভাগে বিভক্ত। সবচেয়ে শক্তিশালী অংশ হচ্ছে ‘সেন্টার’, যা গঠিত হয় উন্নত রাষ্ট্রগুলো দিয়ে। সবচেয়ে দুর্বল অংশ হচ্ছে ‘পেরিফেরি’, যেখানে দরিদ্র দেশগুলো অবস্থান করে। আর মাঝখানের জায়গাটা হচ্ছে ‘সেমি–পেরিফেরি’, যার প্রায় সব কটি রাষ্ট্র ‘পেরিফেরি’ থেকে উঠে এসে অনিবার্যভাবে যত দ্রুত সম্ভব ‘সেন্টারের’ দিকে অগ্রসর হচ্ছে।

এখন দেখা যাক, যে উন্নত রাষ্ট্রটি ‘সেন্টারে’ যায়, তা কীভাবে যায় বা টিকে থাকে। ওয়ালরস্টাইন বলছেন, তার আসল জোরটা শিক্ষায়, গবেষণায়, আবিষ্কারে। তারা এসব ক্ষেত্রে প্রভূত বিনিয়োগ করে বাজারে একেবারে আনকোরা নতুন পণ্য ছেড়ে একচেটিয়া ব্যবসা করে। একচেটিয়া ব্যবসার থলথলে মুনাফা ছাড়া ‘কেন্দ্রে’ টিকে থাকা যায় না। ফলে, নতুন পণ্যটির উৎপাদন-কলাকৌশল যখন জানাজানি হয়ে যায়, তখন তাদের আরেকটি পণ্য আবিষ্কার করতে হয়। সে জন্য সেখানে শিক্ষায় বিপুল বিনিয়োগ একটি অনিবার্য ও নিরন্তর প্রক্রিয়া।

উল্টো দিকে কিছু রাষ্ট্র ‘পেরিফেরিতে’ পড়ে থাকে, কারণ তাদের অদক্ষ শ্রম ও সামান্য কিছু প্রাকৃতিক সম্পদ ছাড়া বলতে গেলে আর কিছুই নেই। তবু এখান থেকে কিছু রাষ্ট্র যে ‘সেমি–পেরিফেরিতে’ যেতে পারে, তার কারণ তাদের শ্রমদক্ষতার উন্নয়ন। শ্রমদক্ষতার পূর্বশর্ত যেহেতু শিক্ষা, তাই যারাই ‘সেমি-পেরিফেরিতে’ গেছে বা যেতে চাইছে, তারাই সাধ্যমতো বা কখনো সাধ্যের বাইরে গিয়ে শিক্ষায় বিনিয়োগ করছে। যেমন: মালয়েশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, কিউবা ইত্যাদি। এমনকি সৌদি আরবের মতো দেশ প্রচুর প্রাকৃতিক সম্পদ থাকা সত্ত্বেও বাজেটের বৃহদংশ ব্যয় করে শিক্ষায়। এ তো গেল বাংলাদেশের চেয়ে যাদের জিডিপির আকার বড়, তাদের কথা। বাংলাদেশের চেয়ে দরিদ্র অনেক দেশও এ ব্যাপারে অনেক এগিয়ে গেছে। যেমন: উগান্ডা তার বাজেটের ১৬ শতাংশ, টোগো ১৭, বুরুন্ডি ২২, লেসেথো ২৪ ও তাঞ্জানিয়া ২৬ শতাংশ শিক্ষার জন্য ব্যয় করে। অথচ বাংলাদেশ, যা ২০২১ সালে ‘সেমি-পেরিফেরিতে’ ঢোকার আশা করে, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ করেছে তার বাজেটের মাত্র ১০ দশমিক ৭ শতাংশ, যা জিডিপির ২ শতাংশ।

অবশ্য বাজেট বেশি হলেই যে শিক্ষা উন্নত হবে বা সে কারণে অর্থনীতি শক্তিশালী হবে, তার নিশ্চয়তা নেই। বিশ্বব্যাংকের মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা–বিষয়ক এক প্রতিবেদনের ‘ইকোনমিক রিটার্নস টু ইনভেস্টমেন্ট ইন এডুকেশন’ অধ্যায়ে বলা হয়েছে, অনেক দেশেই শিক্ষা-বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক উন্নতির মধ্যে পজিটিভ কোরিলেশন পরিলক্ষিত হয়নি। এর কারণ, বিনিয়োগ হয়েছে শিক্ষার প্রসারে, মানে নয়। কোথাও হয়তো অনেক আয়োজন করে ছাত্রদের শুধু মুখস্থ করার দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে, কিন্তু উন্নত চিন্তা-দক্ষতা বাড়ানোর সুযোগ সৃষ্টি করা হয়নি; কোথাও হয়তো ঝোঁকটা ছিল শুধু ছাত্রসংখ্যা বাড়ানোর দিকে, কিন্তু শিক্ষককুল রয়ে গেছেন আগের মতো অদক্ষ, অপ্রতুল, অবহেলিত, নিম্ন আয়ের ‘গোবেচারা’ আজ্ঞাবাহক।

বাংলাদেশ ২০২১ ও ২০৪১ সালে যথাক্রমে ‘সেমি–পেরিফেরি’ ও ‘সেন্টারে’ যাওয়ার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে সে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে এবং শিক্ষা-বিনিয়োগও বাড়াচ্ছে। কিন্তু মুশকিল হচ্ছে, তা জিডিপির আকার অনুযায়ী বাড়ছে না। ২০০৯-১০ অর্থবছরে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ ছিল বাজেটের ১৪ দশমিক ৬৭ শতাংশ, সেখান থেকে পরের বছর কমে হলো ১৩ দশমিক ৬১, তারপর ক্রমান্বয়ে ১৩ দশমিক ১৩, ১২ দশমিক ৩২, ১১ দশমিক ৫৮, ১১ দশমিক ৭ এবং সর্বশেষ এ বছর তা কমে দাঁড়ায় ১০ দশমিক ৭ শতাংশে। ফলে বলা যায়, অর্থনৈতিক অগ্রগতির তুলনায় শিক্ষায় বিনিয়োগ ক্রমাগত পিছিয়ে যাচ্ছে।

এখন কেউ প্রশ্ন করতে পারেন, তাতে কী এমন ক্ষতি হচ্ছে? শিক্ষার যেটুকু উন্নতি হচ্ছে, তাতেই তো নিম্ন আয়ের দেশ থেকে নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশের মর্যাদা পেয়েছে বাংলাদেশ। খাঁটি কথা। কিন্তু ভবিষ্যতে কি এই গতি ধরে রাখা যাবে? জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যাবে না। তাঁদের মতে, সন্তোষজনক অগ্রগতি চাইলে, অর্থাৎ একটি দেশের জনশক্তিকে পুরোপুরি কাজে লাগাতে চাইলে তার জিডিপির ৬ শতাংশ বা বার্ষিক বাজেটের ২০ শতাংশ শিক্ষায় ব্যয় করা উচিত। এর কম হলেই যে অর্থনৈতিক উন্নয়ন হবে না তা নয়—বাংলাদেশ তার প্রমাণ—কিন্তু টেকসই উন্নয়ন চাইলে অর্থনৈতিক অগ্রগতির সঙ্গে সমান্তরালভাবেই শিক্ষায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।

এবার দেখা যাক জিডিপির যে সামান্য অংশ বাংলাদেশ শিক্ষা খাতে বরাদ্দ করে, তা সঠিকভাবে ব্যয় হচ্ছে কি না। সুখের কথা, অনেকটাই হচ্ছে এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে তা ‘যুগান্তকারী’ পরিবর্তন আনতে পারে বললেও ভুল হবে না। যেমন: শিক্ষানীতি প্রণয়ন, কারিকুলামের আধুনিকায়ন ও নতুন পাঠ্যপুস্তক তৈরি, বিনা মূল্যে পাঠ্যপুস্তক বিতরণ, সৃজনশীল প্রশ্নপদ্ধতি প্রবর্তন, ডিজিটাল ক্লাসরুম স্থাপন, ই-বুক প্রণয়ন, নারীশিক্ষার প্রসার, মাদ্রাসাশিক্ষা আধুনিকীকরণ, অবকাঠামোগত উন্নয়ন ইত্যাদি। কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি, যা না হলে উপর্যুক্ত সব অর্জনই শেষ পর্যন্ত অর্থহীন হয়ে পড়বে, সেই শিক্ষকদের বেতন-মান-মর্যাদা বৃদ্ধির কথা নিয়ে সরকার তেমন কিছু করছে না। অবশ্য একেবারে ভাবছে না বললে ভুল হবে। শিক্ষামন্ত্রী বারবারই এ প্রসঙ্গ তোলেন, কিন্তু বাজেটে তার প্রতিফলন ঘটে না।

শিক্ষকদের বেতন-মান-মর্যাদা বৃদ্ধি না হলে শিক্ষাক্রমের আধুনিকায়ন যে কার্যকর হয় না, তার অন্তত দুটি উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। যেমন ইংরেজি শিক্ষার ক্ষেত্রে কমিউনিকেটিভ অ্যাপ্রোচ চালু এবং প্রশ্নের ক্ষেত্রে সৃজনশীল পদ্ধতি প্রবর্তন—এই চমৎকার উদ্যোগগুলো উপযুক্ত শিক্ষকের অভাবে শুধু যে মাঠে মারা যাচ্ছে তা নয়, শিখন-শেখানোর প্রক্রিয়াতেও তা বিরূপ প্রভাব ফেলছে। এ কথা এখন প্রায় কেউই অস্বীকার করেন না যে বাংলাদেশে শিক্ষার ‘প্রসার’ সন্তোষজনক। কিন্তু ‘মান’ নিয়ে যে দ্বিমত আছে, তা এ কারণেই। শিক্ষকেরা ক্লাসে পড়াতে পারছেন না, এমনকি ঠিকমতো প্রশ্নও করতে পারছেন না, ফলে দায় এড়ানোর জন্য পরীক্ষার খাতায় বেশি বেশি নম্বর দিয়ে ছাত্রদের খুশি করে নিজেরা নিরাপদে থাকছেন।

শিক্ষাক্ষেত্রে যেসব উল্লেখযোগ্য সাফল্য ইতিমধ্যে অর্জিত হয়েছে, তা অর্জন করতে শিক্ষকদের সাহায্যের প্রয়োজন হয়নি। এসব কাজ আমলা, দেশপ্রেমিক বুদ্ধিজীবী বা বিদেশি কনসালট্যান্টরাই করেছেন। কিন্তু এর পরের ধাপ—শিক্ষাক্রম বাস্তবায়ন, নতুন পাঠ্যবই পড়ানো, সৃজনশীল প্রশ্ন তৈরি করা, আধুনিক পদ্ধতিতে পাঠদান করা—তো শিক্ষকদেরই বাস্তবায়ন করতে হবে। সেখানেই সমস্যা। কম বেতনে, বিনা পুরস্কারে এবং নামমাত্র প্রশিক্ষণ নিয়ে ক্লাস উপচে পড়া ছাত্রছাত্রীদের আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত করা অপ্রণোদিত শিক্ষকদের পক্ষে একেবারে অসম্ভব না হলেও দুরূহ তো বটেই।

শিক্ষকদের এই বেহাল অবস্থা নতুন নয়। প্রায় সব দেশে শিক্ষকেরা চিরকালই অবহেলার শিকার হয়েছেন। কারণ, শিক্ষা কখনো সরাসরি উৎপাদনশীল খাত বলে বিবেচিত হতো না। যখন থেকে জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতির ধারণা জনপ্রিয় হলো বা শিক্ষা আধুনিক পুঁজিবাদী রাষ্ট্র উন্নয়নের অবিচ্ছেদ্য অনুষঙ্গ হয়ে দাঁড়াল, তখন থেকে রাষ্ট্রগুলো শিক্ষাব্যবস্থার মেরুদণ্ডে (শিক্ষকদের) গুরুত্ব দেওয়া শুরু করল। খোঁজ নিলে দেখা যাবে, উন্নত ও সত্যিকার অর্থে উন্নয়নপিপাসু প্রায় সব দেশ গত কয়েক দশকে শিক্ষকদের বেতন-মান-মর্যাদা প্রায় কয়েক গুণ বৃদ্ধি করেছে। বাংলাদেশ সরকারও যে তা উপলব্ধি করেনি তা নয়, কিন্তু হয় অর্থাভাবে বা অন্য কোনো অজানা কারণে তা বাস্তবায়ন করা যাচ্ছে না।
কিন্তু যেভাবেই হোক, শিক্ষকদের বেতন-মান-মর্যাদা বাড়াতেই হবে। দারিদ্র্য ও অবহেলায় পীড়িত, কুণ্ঠিত, ন্যুব্জদেহ এই শিক্ষককুলের পক্ষে সরকার-পরিকল্পিত আধুনিক শিক্ষার গুরুভার বহন করা সম্ভব নয়। তাঁরা হয়তো জোরেশোরে এর প্রতিবাদ করবেন না। কিন্তু গল্পের সেই ‘গোবেচারা’ শিক্ষকের মতো ক্লাসে না পড়িয়ে, খাতা না দেখে কেবল সোজা প্রশ্ন করে এবং বেশি বেশি নম্বর দিয়ে ছাত্রদের পাস করিয়ে দেবেন—অথর্ব প্রজন্ম তৈরি করে, ইচ্ছায় হোক কিংবা অনিচ্ছায়, নীরবে, নিভৃতে এক নিষ্ঠুর প্রতিশোধ নিয়ে নেবেন।
সবাইকে লক্ষ রাখতে হবে যে এই প্রলয়ংকরী ঘটনা যেন না ঘটে। শিক্ষকেরা যেন মনপ্রাণ দিয়ে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গড়ে তোলার সুযোগ ও প্রণোদনা পান। একমাত্র তাঁদের তৈরি শিক্ষিত দক্ষ জনশক্তিই বাংলাদেশকে একটি মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করতে পারে।

গোলাম ফারুক: ফলিত ভাষাতত্ত্ববিদ, গবেষক, অধ্যাপক।

এডুকেশন বাংলা/এজেড

সব খবর
এই বিভাগের আরো খবর