বৃহস্পতিবার ২২ আগস্ট, ২০১৯ ১৯:৪০ পিএম


জন্মদিন

আমাদের সায়ীদ স্যার

শুভ কিবরিয়া

প্রকাশিত: ০৮:৫৮, ২৫ জুলাই ২০১৯  

আজ বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যার ৮০ বছর পার করে ৮১ বছরে পা দিচ্ছেন। আমাদের পরম সৌভাগ্য, আমরা স্যারের মতো এ রকম মানুষের ভালোবাসা ও স্নেহ দুটিই পেলাম।

সায়ীদ স্যার আমাদের সময়ের অসম্ভব গুণগ্রাহী মানুষ। সারা জীবনে তিনি যত কর্মকাণ্ড করেছেন, সবখানেই এই গুণগ্রাহিতার ছোঁয়া পাওয়া যায়। আমাদের এখানে সাধারণত সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলো গড়ে ওঠে মূলত একক ব্যক্তির শ্রম, স্বপ্ন আর ভালোবাসায়, অসম্ভব ত্যাগের ওপর ভিত্তি করে। ফলে প্রতিষ্ঠানের সর্বত্র সেই ব্যক্তির একটা অমোচনীয় ছাপ থেকে যায়। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রও তার ব্যতিক্রম নয়। এখানে একটা যৌথ প্রচেষ্টা আছে বটে; তবে সায়ীদ স্যারের স্বপ্ন ও সাধের সবিস্তার উপস্থিতি আছে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রজুড়ে। আছে তাঁর গুণগ্রাহিতার ছোঁয়াও।

বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র তাই সব ধরনের মানুষের জন্য এক আত্মিক প্রেরণার জায়গা হয়ে উঠেছে গত চার দশকেরও বেশি সময়জুড়েই। মজার ব্যাপার, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের একটা অবকাঠামোগত বাহ্যিক চেহারা এখন দাঁড়িয়েছে বটে; কিন্তু এর আত্মিক চেহারাটা খুবই অশারীরিক। যে যার মতো করে অনুভব করে। অনেকটা অন্ধের হাতি দর্শনের অভিজ্ঞতার মতো।

২০০৪ সালে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র এবং সায়ীদ স্যার যখন ম্যাগসাইসাই পুরস্কার পেলেন তখন। সে সময় আমি বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে কাজ করি। ফিলিপাইনের ম্যানিলায় এই পুরস্কার আনতে স্যারের কল্যাণে আমিও তাঁর সঙ্গী হয়েছি। খেয়াল করলাম, ম্যানিলায় ম্যাগসাইসাই পুরস্কার অনুষ্ঠান উপলক্ষে সেখানে যত জায়গায় সায়ীদ স্যার বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র, তাঁর সংগ্রাম এবং স্বপ্নের কথা বলেছেন, আলোকিত মানুষ গড়ার আকাঙ্ক্ষার অবয়ব তুলে ধরেছেন, সেখানকার মানুষ সেটা খুব আগ্রহ সহকারে গ্রহণ করল।

চিরায়ত শুভ মূল্যবোধ ছাড়া, বড় হৃদয়ের মানুষ ছাড়া যে বড় জাতি তৈরি হয় না এবং সেটা না হলে যে সমষ্টির কল্যাণধর্মী একটা রাষ্ট্র দাঁড় করানো যায় না- স্যারের এই কথা সেখানকার দর্শক-শ্রোতাদের খুব গভীরভাবেই স্পর্শ করল। সেখানকার সিভিল সমাজ ও মিডিয়ায় সায়ীদ স্যার অন্যান্য ম্যাগসাইসাই অ্যাওয়ার্ডির চেয়ে তাই একটু আলাদা সমীহের চোখেই আলোচিত হলেন।

দুই. ম্যাগসাইসাই পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠানটির আগে প্রায় সপ্তাহখানেকের নানা প্রোগাম। প্রতিদিন বেশ ক`টা প্রতিষ্ঠানে গিয়ে বক্তৃতা করতে হতো। প্রতিদিনের বক্তৃতায় সায়ীদ স্যারকে ব্যাখ্যা করতে হতো তাঁর কাজ সম্পর্কে। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র সম্পর্কে। তিনি বলতেন, আলোকিত মানুষ কেন দরকার? কেন উচ্চতর বই পড়ে, মহত্তর সাংস্কৃতিক সাধনার মধ্য দিয়ে তরুণ বয়সে, বৈষয়িক প্রতিষ্ঠার ইঁদুর দৌড়ের চেষ্টার মধ্যেও একটা হৃদয়ভিত্তিক অবকাশ দরকার, যা মানুষকে আলোকিত হওয়ার পথে যেতে সাহায্য করে। সায়ীদ স্যার তাঁর স্বভাবসুলভ হাস্যরস আর দার্শনিক ব্যাখ্যার ভিয়েন মিশিয়ে সহজ করে `আলোকিত মানুষ` বিষয়টির ওপর আলোকপাত করতেন। স্যারের এই আলোকভাবনা ওখানকার মানুষকে দারুণভাবে ছুঁয়েছে।

এক দিনের কথা মনে আছে। ফিলিপাইনের ভারতীয় হাইকমিশনে একটা পার্টি দিয়েছেন স্থানীয় ভারতীয় হাইকমিশনার। প্রায় জনাপঞ্চাশ দেশের রাষ্ট্রদূত আর ম্যাগসাইসাই পুরস্কার পাওয়া সাতজন এবং তাদের সঙ্গীরা ওই অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত। একটা লম্বা ঘরে সবাই সমবেত হয়েছেন। ম্যাগসাইসাই অ্যাওয়ার্ডিরা সবাই দু-চার কথা বললেন নিজের কাজ সম্পর্কে। স্যারকেও ডাকা হলো।

স্যারের বেশভূষা, অবয়ব সবার দৃষ্টি কেড়েছে। অনুষ্ঠানটা সন্ধ্যার পরপর। ওইদিন দুপুরে স্যার কিছুক্ষণ ঘুমুতে পেরেছেন। ভরাট গলায় কথা শুরু করলেন এই বলে যে, `আমি এমন একটা দেশ থেকে এসেছি, যেখানে বছরে আমাকে এক ঘণ্টাও ইংরেজিতে কথা বলতে হয় না। কাজেই সবাই আমার ইংরেজি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন।` তারপর শুরু করলেন। স্যারের কথাটা ছিল এ রকম, `Little minds and great nations cannot go together. Consequently, our aspiration for greatness as a nation must be matched by our commitment to create enlightened people within the nation. And therefore, our endeavor is to create for Bangladesh an informed, enriched and committed generation of future citizens. In this, our focus has been on the youth.’

হলরুমজুড়ে পিনপতন নীরবতায় সবাই মন্ত্রমুগ্ধের মতো স্যারের কথা শুনছেন। বক্তৃতা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হলভর্তি সবার সে কী করতালি। মধ্যপ্রাচ্যসহ ইউরোপের ক`জন রাষ্ট্রদূত স্যারকে জড়িয়ে ধরলেন। সবার চোখেমুখে সে এক অনির্বচনীয় আলোকদ্যুতি।

তিন. সায়ীদ স্যারের ৮০ বছরের জীবন কর্মে ও স্বপ্নে পূর্ণ। স্যারের কাছে আমাদের কৃতজ্ঞতা এই যে, আমাদের জন্য তিনি বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের মতো প্রতিষ্ঠান রেখে গেলেন। আজ হয়তো নানা সামাজিক-রাজনৈতিক ডামাডোলে বোঝা সম্ভব নয়, কী এক আলোকখনি তিনি আমাদের জন্য তৈরি করেছেন। কিন্তু বাংলাদেশ যখন আরও বড় হবে, রাষ্ট্র হিসেবে আরও সংহত হবে, আমাদের দৃষ্টি যখন আরও প্রসারিত ও উদার হবে, তখন হয়তো এই মানুষটির প্রতি আমাদের মনোযোগ আরও সুবিবেচনা পাবে।

নির্বাহী সম্পাদক, সাপ্তাহিক


এডুকেশন বাংলা/এজেড

সব খবর
এই বিভাগের আরো খবর