বৃহস্পতিবার ২২ আগস্ট, ২০১৯ ১৯:১৪ পিএম


আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় বইটাকে খুব গুরুত্ব দিতে পারিনি’

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ০৯:৫১, ১৯ জুলাই ২০১৯  

প্রযুক্তির অনেক সুবিধা আছে। অনেক কিছুই সহজ করে দিয়েছে প্রযুক্তি। এই সুবিধা আর সহজলভ্যতাকে আমরা কতটা ঠিকঠাকভাবে গ্রহণ করছি, এর কতটা অপ্রয়োজনে ব্যবহার করছি; তার ওপরই নির্ভর করছে প্রযুক্তি থেকে আমাদের প্রাপ্তি তথা সুবিধাভোগ। যে ছেলেটি ফোনে বা কম্পিউটারে ফুটবল ক্রিকেট খেলছে- তার মস্তিষ্কের চর্চা হলেও অলসতার কারণে শরীর স্থূল হয়ে পড়ার আশঙ্কা থেকে যাচ্ছে। ফেসবুকসহ অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেকেই বিভিন্ন বিষয়ে মন্তব্য করেন, এত দ্রুত করেন যে, প্রায় সময়ই তাদের কথার মধ্যে চিন্তার ছাপ খুঁজে পাওয়া যায় না। জ্ঞানার্জনের জন্য বইয়ের চেয়ে সহায়ক অন্য কিছু নেই। প্রযুক্তির কল্যাণে জ্ঞান এবং তথ্যের সহজলভ্যতা মুদ্রিত বইয়ের ওপর কেমন প্রভাব ফেলছে এবং ভবিষ্যতে মুদ্রিত বইয়ের সঙ্গে প্রযুক্তির সম্পর্ক নিয়ে ‘প্রযুক্তির যুগে বইয়ের সঙ্গে পাঠকের সম্পর্ক’ শিরোনামে দৈনিক যুগান্তর গত ১৩ জুলাই শনিবার একটি আড্ডার আয়োজন করে। আয়োজনে উপস্থিত কয়েকজন অতিথির অভিমত ও বক্তব্য এডুকেশন বাংলা`র পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো।

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম
কথাসাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক

বইয়ের প্রযুক্তি বহু আগের। এখন শুধু প্রযুক্তির বিবর্তন হচ্ছে। এখানে যারা বললেন তাদের অনেকের মতো আমিও বিশ্বাস করি- বই থাকবে, কিন্তু বইয়ের বিবর্তন হবে। পশ্চিমে আমি দেখেছি- একসময় কিন্ডল গেল, একটা কিন্ডল হচ্ছে- যেখানে পাতা উল্টানোও দেখা যায়। আমার একটা কিন্ডল আছে- সেখানে দশ হাজার বই আছে।

তারপর আসল ই-বুক। তারপরও কিন্তু পশ্চিমে বইয়ের উৎপাদন বেড়ে চলেছে। ফ্রাংফুটে যে বইমেলা হয়, পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বইমেলা, সেটাকে টেক্কা দিয়ে এখন সানহাইয়ের বইমেলা হচ্ছে। আমাদের বইমেলায় বই বিক্রি বাড়ছে। কলকাতার বইমেলায়ও বাড়ছে; অর্থাৎ বইয়ের গ্রাহক তৈরি হচ্ছে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে আমরা আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় বইটাকে খুব গুরুত্ব দিতে পারিনি। মুখস্থনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থায় যা পড়ানো হবে সেটি আমি অনলাইনে গেলে পেয়ে যাব। কারণ আমাকে তো একটা টিক মার্ক দিতে হয়। ঐ দেখা যায় তালগাছ, তালগাছ কী? একটি গাছ। তালগাছ কী? একটা গরু। আপনি যেখানে দেবেন টিক সেটাই তো ঠিক। আমি পশ্চিমে দেখেছি তারা প্রযুক্তি ব্যবস্থাপনা শিখে ফেলেছে। প্রযুক্তির ব্যবহারে সুন্দর ছাপাখানা হচ্ছে। আমাদেরও কিছু কিছু ছাপাখানায় ঝকঝকে ছাপা হচ্ছে। আমার বিশ্বাস বই মানুষ হাতছাড়া করবে না। বইয়ের সঙ্গে মানুষের সভ্যতার ইতিহাসের একটা সম্পর্ক রয়েছে। এই বইয়ের স্পর্শে ঘ্রাণে এক ধরনের নস্টালজিয়াও কাজ করে। আমাদের পুরো জাতিসত্তার একটা চিন্তা স্পর্শ এবং ঘ্রাণ জড়িত বইয়ে। আমরা সেটা ছাড়তে পারব না। যখন আমাদের একশ’ ভাগ মানুষ বই কেনার সামর্থ্যে পৌঁছবে- তখন বইয়ের সংখ্যা আরও বাড়তে থাকবে। পশ্চিমে আমি দেখেছি- বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এক সময়তো ভয় পেত, সব অনলাইনে পড়ানো হবে! অনলাইনে একটা ক্ষুদ্র অংশ শুধু পড়ানো হয়। বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয়ের যে গ্রন্থাগারগুলো থাকে, সেখানে গেলে বইয়ের সংগ্রহ দেখে মাথা খারাপ হয়ে যায়- এত এত বই সেখানে। বইয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত হওয়ার কারণ নেই। তবে হ্যাঁ, মুদ্রিত বইয়ের পাশাপাশি ই-বুক তো থাকবেই। একটা আরেকটাকে বাতিল করবে না। একটা আরেকটার সহায়ক হবে। একটা কথা উঠেছে জ্ঞান এবং তথ্য নিয়ে। আমাদের শিক্ষার একটা উদ্দশ্য হচ্ছে- তথ্যকে জ্ঞানে পর্যবশিত করে জ্ঞানকে প্রজ্ঞায় রূপান্তর করা- এটা হচ্ছে শিক্ষার উদ্দেশ্য। তথ্য আমি ইন্টারনেটে পাব, হয়তো জ্ঞানও পাচ্ছি- কিন্তু প্রজ্ঞার জন্য আমাদের বইয়ের দ্বারস্থ হতে হবে।

সাইফুল আলম
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, দৈনিক যুগান্তর

অল্প সময়ের মধ্যে আমাদের এ আয়োজন সম্পন্ন করা হলেও আমরা লক্ষ করছি সাহিত্যের অনেক উজ্জ্বল ব্যক্তি এখানে সমবেত হয়েছেন। এ আয়োজন যুগান্তরের নতুন ধরনের কার্যক্রমের সূচনামাত্র। আমরা নিয়মিত এ ধরনের আয়োজন অব্যাহত রাখতে চাই। শিল্পী-সাহিত্যিক-সাংবাদিকসহ গুণীজনদের সঙ্গে নিয়ে যুগান্তর দেশ এবং সমাজের কল্যাণে আরও সক্রিয় হতে চায়। এ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে গত ১২ জুলাই যুগান্তর কার্যালয়ে একটি আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ওই অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছেন দেশের কয়েকজন খ্যাতিমান নারী গুণী ব্যক্তিত্ব। তাদের গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় নারীদের বিভিন্ন সমস্যার বিশেষ কিছু দিক উঠে এসেছে। পাঠকের কাছে কেবল খবর পৌঁছানোর মাধ্যমেই যুগান্তর তার দায়িত্ব সীমিত রাখতে চায় না, এর পরিচয় আপনারা আগেও পেয়েছেন। দেশ ও জনগণের কাছে আমাদের যে দায়বদ্ধতা রয়েছে, সেই দায়বদ্ধতা থেকে নিয়মিত বিভিন্ন ইস্যুতে অনুষ্ঠানের আয়োজন করতে চাই। এর মূল উদ্দেশ্য বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার পাঠক ও গুণীজনের সঙ্গে আমাদের বন্ধন আরও দৃঢ় করা। আমি আশাবাদী, আমাদের আয়োজনগুলো আগামীতে আরও বড় মিলনমেলায় পরিণত হবে। অনলাইনের প্রবল স্রোতেও মুদ্রিত বইয়ের সংখ্যা ও পাঠক ক্রমাগত বাড়ছে। আমার ধারণা মুদ্রিত বইয়ের পাঠক বৃদ্ধির ধারা আগামীতেও অব্যাহত থাকবে। প্রযুক্তি সহজলভ্য হওয়ায় নতুন প্রজন্মের অনেকেই তাতে বুঁদ হয়ে আছে। এ অবস্থায় আমাদের দায়িত্ব তাদের পাঠ্যাভ্যাস গড়ে তোলা। সবাই যদি আমাদের দায়িত্ব ঠিকভাবে পালন করতে পারি, তাহলে মুদ্রিত বই হারিয়ে যাবে না বরং এর চাহিদা আরও বাড়বে।

জাহিদুল হক
কবি, কথাসাহিত্যিক

খুব বৃষ্টি হচ্ছে গত কয়েকদিন, এই আষাঢ় মাসের শেষে। প্রযুক্তি, বই আর পাঠক নিয়ে ‘যুগান্তর’র এই গোলটেবিলে আমরা যখন কথা বলছি তখনও বাইরে ঝুম বৃষ্টি। প্রযুক্তি নিয়ে কথা বলার বদলে বরং বলতে ইচ্ছা করছে, ‘...হামারো দুঃখের নাই ওর/ এ ভরা বাদরো মাহ ভাদরো / শূন্য মন্দিরো মোর’!

প্রযুক্তি আর মানুষের ভোগবাদিতা কিন্তু এই বৃষ্টিকে ছিনিয়ে নিচ্ছে, হিমালয় আর মেরুর বরফকে গলিয়ে দিচ্ছে, নদীগুলো মরে যাচ্ছে, খনিজসম্পদ তুলে তুলে শূন্য করে দিচ্ছে পৃথিবীর জঠর, ভূমিকম্পপ্রবণ হয়ে উঠছে মাটির অভ্যন্তর আর ছিঁড়ে খুবলে তছনছ করে ফেলা হচ্ছে ওজন-লেয়ারকে! ফলে শুরু হয়েছে ভয়ংকর পরিবেশ বিপর্যয়। ঝড়ে, বন্যায়, ভূমিকম্পে আর গ্লোবাল ওয়ার্মিংয়ে- বা ধর্মগ্রন্থে উল্লেখিত ‘কেয়ামতের আগে মাথার ওপর সুরুজ’- নেমে আসায় মানবসভ্যতা এখন ধ্বংসের মুখোমুখি। অথচ এ প্রযুক্তিই একদা মানুষকে অন্যান্য প্রাণিজগৎ থেকে আলাদা করে র‌্যাশনাল অ্যানিমেলে রূপান্তরিত করেছিল। মানুষ পাথর ছুড়ে বন্যপ্রাণীর আক্রমণ থেকে নিজেকে রক্ষা করে ও খাদ্যাদি সংগ্রহ করে, আগুন জ্বেলে, লোহা ব্যবহার করে, গুহার দেয়ালে এঁকে-লিখে, গাছের ছালপাতা-চামড়া-পাথরে লিখে লিখে আজকের কাগজে মুদ্রিত বইতে এবং সেই সঙ্গে আজকের এই মানুষে এসে দাঁড়িয়েছে মানুষ। এর সবই প্রযুক্তিরই মধ্য দিয়ে হয়েছে। আজকের, আমার হাতের এই মুদ্রিত বইটিও প্রযুক্তিরই। কথা হচ্ছে, এই প্রযুক্তিই এখন ই-বুক, বিদ্যুৎ-বই এমনকি, হয়তো, থ্রি-ডাইমেনশনাল-তিন মাত্রার-বই তৈরির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, যা পাঠকের সংঙ্গে পাঠ ও বইয়ের সম্পর্ক নষ্ট করবে কিনা, বিরহ-বিচ্ছেদ তৈরি করবে কিনা, এই প্রশ্নটি উত্থাপন করছে। আমাদের আশঙ্কা, করতেও পারে। ইন দ্যাট কেইস, যদি করে, আমরা কী করব? ইয়েপ, আমরা প্রযুক্তির সেই বইগুলো পড়ব না এবং আমরা প্রযুক্তির সেই অগ্রগতিকে থমিয়ে দেব। প্রযুক্তির বল্গাহীন ঘোড়ার বল্গাকে টেনে ধরব, তাইনা? আমরা তো সেই প্রযুক্তিরই বই পড়ব যে প্রযুক্তির বই আমাদের কমফোর্ট দেবে! কেন, বিজ্ঞান-প্রযুক্তির তৈরি-করা পারমাণবিক বোমার ব্যবহারের প্রযুক্তিকে কি আমরা থামিয়ে রাখছি না? পাঠক ছিল, আছে, থাকবে। আজকের বইটিও একটি প্রযুক্তিরই ফসল। আমরা বই ধরব, গন্ধ নেব, ইচ্ছা মতো বসে, শুয়ে, কাত হয়ে, চিত হয়ে যেমন খুশি পড়ব- প্রযুক্তির যে বইটি পাঠককে আরাম করে পড়তে দেবে!

রফিকুল হক দাদুভাই
শিশুসাহিত্যিক, সাংবাদিক

প্রযুক্তি যতই অগ্রসরমান হোক, মুদ্রিত বইয়ের অপরিহার্যতা কখনও বিঘ্নিত হবে না। বইয়ের সঙ্গে পাঠকের সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড় এবং আবেগের। সংগৃহীত একটি বইয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পাঠক ও সংগ্রহকারীর ব্যক্তি মালিকানার সম্পর্ক। যা তার বইয়ের তাকে সদাদৃশ্যমান হয়ে বিরাজ করে। যা তিনি পরবর্তীতে তার উত্তরাধিকারীর কাছে হস্তান্তর করে যেতে পারেন।

মুদ্রিত গ্রন্থ প্রামাণ্য দলিল হিসেবে যুগযুগ সংরক্ষিত হয়ে আসছে এবং থাকবে। এ কারণে মুদ্রিত বইয়ের প্রয়োজন কখনও ফুরাবে না। প্রযুক্তির অগ্রগতি সেবাকে সহজলভ্য করে। এর অপপ্রয়োগ বিপর্যয়ও ডেকে আনে। সাহিত্যের আড্ডায় যেসব খ্যাতিমান কবি ও লেখক অংশ নিয়েছেন তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা।

আতা সরকার
কথাসাহিত্যিক

শিরোনাম থেকে বুঝতে পারছি, প্রযুক্তির সাম্প্রতিকতম বিকাশ পর্যায়ে বইয়ের সঙ্গে পাঠকের সম্পর্ক কোন মাত্রায় পৌঁছবে। প্রযুক্তি বিশেষ করে ভার্চুয়াল প্রযুক্তি কি বইয়ের বিলুপ্তি ঘটাবে? পাঠক তো তিনিই যিনি পাঠ করেন। চলতে চলতে রাস্তার দু’পাশে যত সাইনবোর্ড বিলবোর্ড, পথিক তো তাও পড়ে। সাইনবোর্ডের রূপবদল হতে পারে, কিন্তু বিপণনের সুবিধার জন্য তার বিলোপ ঘটবে না। গ্রাহক এখান থেকে উদ্বুদ্ধ হয়ে তার চাহিদার পণ্যের প্রতি আকৃষ্ট হবেই। এ আড্ডার উপস্থিতি এবং মেজাজ থেকে বুঝতে পারছি, বই বলতে এখানে সাহিত্যের বই শনাক্ত করা হয়েছে। এ দেশের জনগোষ্ঠীর কবেই বা তেমন পাঠাভ্যাস পোক্ত ছিল? যতটুকু অভ্যাস, তাও কি ক্রমবিলীয়মান- জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে? আমাদের তরুণকালে যে কোনো বই কমপক্ষে ১২৫০ কপি ছাপানো হতো; এখন তা নেমে এসেছে ৩০০ কপিতে। এর জন্য দায়ী কি প্রযুক্তি? পাঠক? পাঠকরা ভার্চুয়াল জগতে আকৃষ্ট হয়েছেন। আধুনিক প্রযুক্তির ফেসবুকে মাতোয়ারা। সেটা কি বই পাঠের চাহিদা মেটানোর জন্য? যার বই পাঠের আগ্রহ তিনি তো তার চাহিদার বই খুঁজবেনই- সেটা কাগজে মুদ্রিত বই হোক, অথবা ই-বই, অনলাইনে, ই-মেইলে বা ফেসবুকেই হোক। পড়ার সুবিধাটা কিন্তু কাগজের বইয়েই। কিন্তু পাঠক কেন সাহিত্যের বইয়ের প্রতি আকৃষ্ট হবে সেটা যদি তার চাহিদা মেটাতে সক্ষম না হয়? সাহিত্যিকরা কি পাঠকের মনের গভীরে প্রবেশ করতে পেরেছেন? স্বীকারোক্তি করতেই হয়, এখানে যে গল্প উপন্যাস লেখা হয় তা যখন নোবেল প্রাইজ পাওয়ার জন্য। অবোধ্যতা দুর্বোধ্যতা তার চরিত্র। নিখাদ প্রেমের কবিতা ক’টা লেখা হয় দেহজ কামজ আকুতি ছাড়া, যেখানে যৌনতার প্রাধান্য, হৃদয়ের নয়। এমন সাহিত্য বইয়ের প্রতি পাঠক আকৃষ্ট হবেন কেন? এর দায় পাঠকের চেয়ে সাহিত্যিকেরই বেশি। মানুষ পড়েন। পাঠপ্রবণতা তার রয়েছে। যা পড়েন তা হয়তো ভিন্ন কিছু। পাঠকের মৃত্যু নাই- কালে কালে, প্রযুক্তির চূড়ান্ত বিকাশকালেও। আর পাঠের জন্য বই থেকেই যাবে। পাঠ বিবর্তনে দেখি, মানুষ পাথরে খোদাই করে মনের ভাব প্রকাশ করতে শুরু করেছিল, প্রাণীর চামড়ায় লিখেছে, গাছের বাকল ও পাতায় লিখেছে, কাগজ তৈরি করে হাতে লিখেছে, টাইপরাইটারে লেখা হয়েছে, মুদ্রণযন্ত্র আবিষ্কার করে ছাপার হরফে লেখা হয়েছে, এসেছে প্রযুক্তির নতুন সংস্করণ- কম্পিউটার আর তার অনুষঙ্গ। বইয়ের রূপান্তর হতে পারে, কিন্তু তার সঙ্গে পাঠকের বিযুক্তির সম্ভাবনা দেখা যায় না। কখনও কখনও প্রযুক্তি যখন ব্যর্থ হয়, থেমে যায়, কম্পিউটার ভাইরাস আক্রান্ত হয়, আমরা আশ্রয় নিই সনাতন পদ্ধতির কাছে। হাতের কাছেই পেয়ে যাই কাগজে মুদ্রিত বই।

ফারুক মঈনউদ্দীন
কথাসাহিত্যিক, অনুবাদক

বিষয়টির মূল বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, প্রযুক্তির বর্তমান উৎকর্ষের সঙ্গে পাঠক মুদ্রিত বইয়ের প্রতি বিমুখ হয়ে পড়বে কিনা, এটিই আশঙ্কার ব্যাপার। গ্রন্থপাঠের সঙ্গে প্রযুক্তির ব্যবহারের প্রবণতা বাড়ছে বহুবিধ কারণে, তার একটি প্রধান কারণ হচ্ছে, স্বাচ্ছন্দ্য। এক আমেরিকান পাঠিকা জানিয়েছেন, তিনি ট্যাব ব্যবহার করে বই পড়ার অভ্যেসটা চালু করেছেন তার প্রথম সন্তান জন্মানোর পর। কারণ তিনি এমন একটি সুবিধে চাইছিলেন যাতে এক হাতে সন্তানকে স্তন্যপান করাতে করাতে অন্য হাতে বই পড়তে পারেন। তার পর থেকে ব্যবহারিক স্বাচ্ছন্দ্যের জন্যই তিনি মুদ্রিত বইয়ের চেয়ে ডিজিটাল বই পড়াকে অগ্রাধিকার দেন। মানুষের স্বাচ্ছন্দ্যের জন্যই প্রযুক্তির উদ্ভব ও ব্যবহার। আমরা চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের যে যুগে প্রবেশ করেছি, তার অভিঘাতে বহু প্রতিষ্ঠিত শিল্প নতুন প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনী শক্তির কাছে পরাজিত হতে চলেছে। এসব নতুন সেবা ও পণ্যকে গতানুগতিক ধারণা ছেড়ে নতুন উদ্ভাবিত সেবা গ্রহণ করতে হবে। এ বিপ্লবের ফসল হিসেবে ২০২৫ সালের মধ্যে বিশ্বের ১০ শতাংশ মানুষের পরিধেয় বস্ত্রের সঙ্গে সংযুক্ত থাকবে ইন্টারনেট, ১০ শতাংশ মানুষের চশমার সঙ্গেও ইন্টারনেট সংযুক্ত থাকবে, পাওয়া যাবে মানুষের শরীরে স্থাপনযোগ্য মোবাইল ফোন। প্রযুক্তিগত এসব পরিবর্তনের সঙ্গে আমাদের নিজেকে খাপ খাইয়ে নিতে হবে। পাশ্চাত্যের লেখক কবিরা বহুদিন আগে থেকেই টাইপ রাইটারে লিখতে অভ্যস্ত। আমাদের দেশের লেখকদের মধ্যে সৈয়দ শামসুল হকই প্রথম বাংলা টাইপ রাইটার ব্যবহার করে লিখতে শুরু করেছিলেন। তারপর থেকে কম্পিউটারের ব্যবহার শুরু হওযার পর থেকে অনেকেই আজকাল ল্যাপটপ বা কম্পিউটারে লেখেন। আমিও গত বছর দশেক ধরে ল্যাপটপে লিখছি। এ প্রযুক্তির ব্যবহার দিয়েছে সংশোধন ও সংযোজনের অবাধ সুবিধা। গ্রন্থপাঠের বিষয়টিও প্রযুক্তির সুবিধার সঙ্গে সম্পর্কিত। তবে প্রকৃত বইপ্রেমীরা বই পড়া থেকে কখনই বিচ্যুত হবে না, বিলুপ্ত হবে না মুদ্রিত বইয়ের আবেদনও। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বইমেলা কিংবা আমাদের একুশে গ্রন্থমেলায় ক্রমবর্ধমান হারে প্রকাশিত ও মুদ্রিত বইয়ের সংখ্যা সেই সাক্ষ্যই দেয়।

ফারুক মাহমুদ
কবি

প্রযুক্তি আর প্রগতির মধ্যে কোনো বিরোধ নেই। প্রযুক্তির ভালোটা গ্রহণ করা প্রগতির কাজ। প্রযুক্তি মানব সভ্যতাকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। এর সদ্ব্যবহার না-করে অপব্যবহার করাটা গ্রহণযোগ্য নয়। বই বা ছাপাছাপির কাজটা সভ্যতার স্মারক। এক সময় গুহাগাত্র, পাথরে আঁকা-লেখা হতো। তারপর এল পাতা, বল্কলে লেখার যুগ। মুদ্রণকার্য এলো অনেক পরে। আমার এ ছোট্ট জীবনে পায়েচাপা ছাপাযন্ত্র দেখেছি। কাঠ-সিসার অক্ষর। কাঠের ব্লক থেকে সিসা, লাইনো- এখন তো অফসেটে ঝকঝকে ছবি। সিটিপির যুগ চলছে। আরও কত কী দেখব! ই-পাঠকের হাতে বই যাচ্ছে সহজে, আকর্ষণীয় অবয়বে। প্রযুক্তি সহযোগিতা করছে। ই-বুক এসেছে। বই পাওয়া, বই পড়া সহজতর করে দিচ্ছে নতুন নতুন প্রযুক্তি। মানবসভ্যতা টিকে থাকলে বই থাকবে। লেখক থাকবে, পাঠক থাকবে। তবে বইয়ের চেহারায় পরিবর্তন আসবে এবং এ আসাটাই প্রযুক্তির সুফল।

এডুকেশন বাংলা/এজেড

সব খবর
এই বিভাগের আরো খবর