মঙ্গলবার ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ০:১৭ এএম


আমরা প্রশিক্ষণকে আধুনিক করার কথা কতটুকু চিন্তা করি?

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ০৬:২০, ৬ আগস্ট ২০২০  

সবাই বলেন প্রশিক্ষণের বিকল্প নেই, প্রশিক্ষণই সক্ষম কাউকে যুগোপযোগী করতে, প্রশিক্ষণই উন্নয়নের কারিগর সৃষ্টি করে বা প্রশিক্ষণ ছাড়া উন্নয়ন অসম্ভব ইত্যাদি। কিন্তু বাস্তবে তার কতটুকু প্রতিফলন ঘটে? কতটুকু গুরুত্ব দিই আমরা প্রশিক্ষণকে? প্রশিক্ষণ-সংশ্লিষ্টরা সমাজে যথাযথ সম্মান পান? আমরা প্রশিক্ষণকে আধুনিক করার কথা কতটুকু চিন্তা করি? দেশের প্রশিক্ষণ ব্যবস্থাপনা নিয়ে এ ধারাবাহিক আলোচনা।

প্রশিক্ষণের প্রয়োজনীয়তা অনাদিকাল থেকেই অনুভূত হয়ে আসছে। চীন, মিশর ও ভারতীয় সভ্যতার প্রাচীন ইতিহাস থেকে জানা যায় যে, সে সময়ও (আনুমানিক ১০০ খ্রিষ্টাব্দ) সরকারি কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণের উদ্যোগ গ্রহণ করা হতো। প্রাচীন মিশরের আমলারা প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ছিলেন (৩১০০-২২০০ খ্রিষ্টপূর্ব)। চীনা দার্শনিক কনফুসিয়াস (৫৫১-৪৭৯ খ্রিষ্টপূর্ব), গ্রিক দার্শনিক প্লেটো (৪২৮-৩৪৭ খ্রিষ্টপূর্ব) এবং ভারতের কৌটিল্য (আনু. ৩২৪-২৪৮ খ্রিষ্টপূর্ব) সরকারি আমলাদের প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। জীবনের উদ্দেশ্য, প্রাথমিক কর্তব্য, শিক্ষার উদ্দেশ্য, বিষয়/পাঠ্যক্রম এবং প্রশিক্ষণ পদ্ধতি সম্পর্কে তারা বিভিন্ন ধরনের নির্দেশনা দিয়েছেন। ভারতের গভর্নর জেনারেল লর্ড ওয়েলেসলি (১৭৯৮-১৮০৫) প্রথমবারের মতো ভারতীয় সিভিল সার্ভিসের সদস্যদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা চালু করেন।

প্রশিক্ষণের আইনি কাঠামো কতটুকু মজবুত বা যথোপযুক্ত, তা প্রথমে বিবেচনা করা যাক। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের দ্বিতীয় ভাগে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি হিসেবে ১৭(খ)-তে উল্লেখ আছে, ‘রাষ্ট্র সমাজের প্রয়োজনের সহিত শিক্ষাকে সংগতপূর্ণ করিবার জন্য এবং সেই প্রয়োজন সিদ্ধ করিবার উদ্দেশ্যে যথাযথ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ও সদিচ্ছা প্রণোদিত নাগরিক সৃষ্টির জন্য’ এবং অনুচ্ছেদ ১৭(গ)-তে উল্লেখ আছে :‘আইনের দ্বারা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নিরক্ষরতা দূর করিবার জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করিবেন।’ এ অনুচ্ছেদ দ্বারা সমাজের প্রয়োজন তথা সামগ্রিক উন্নয়নের লক্ষ্যে সরকারের ইশতেহার, বিভিন্ন মেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যম হিসেবে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের প্রয়োজনীয়তাকে অপরিহার্য ঘোষণা করা হয়েছে। সেই সঙ্গে সমসাময়িক প্রয়োজনীয়তার নিরিখে যথোপযুক্ত নীতিমালা ও আইন প্রণয়নের সুযোগ রাখা হয়েছে।

বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস নিয়োগ বিধিমালা ১৯৮১-এর ৭ অনুচ্ছেদে বলা আছে যে চাকরি স্থায়ীকরণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ লোকপ্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে বা অন্য কোনো প্রশিক্ষণে এবং সরকার কর্তৃক সময়ে সময়ে নির্ধারিত বিষয় বা ক্ষেত্রে কমপক্ষে চার মাসের বুনিয়াদি প্রশিক্ষণ গ্রহণ করতে হবে এবং উক্ত প্রশিক্ষণ সফলভাবে সমাপ্ত না করলে চাকরিতে স্থায়ী করা যাবে না। আরো বলা আছে, বুনিয়াদি প্রশিক্ষণ সম্পন্নের পর চাকরিসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে সরকারনির্ধারিত কোনো পেশাভিত্তিক এবং বিশেষায়িত প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণ করতে হবে।

দেশের সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার একাদশ অধ্যায়ে উল্লেখ আছে, সরকার জাতীয় শিক্ষানীতি-২০১০ এবং জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন নীতি-২০১১ বাস্তবায়নের মাধ্যমে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রম জোরদার করে জনগণের আর্থসামাজিক অবস্থার উত্তরোত্তর উন্নয়ন করবে। অন্যদিকে বৈদেশিক কর্মসংস্থান বৃদ্ধি ও তাদের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য আরো কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ও মেরিন একাডেমি প্রতিষ্ঠা করবে। তাছাড়া দেশ ও বিদেশে কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে এবং প্রশিক্ষকদের জন্য স্থায়ী প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করে প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়ন কার্যক্রমের মানোন্নয়ন করা হবে।

বাংলাদেশকে ২০২১ সালের মধ্যে একটি মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত করার লক্ষ্যে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ প্রদানের মাধ্যমে দক্ষ ও যোগ্য জনশক্তি গড়ে তোলার লক্ষ্যে ৩০ জানুয়ারি ২০১২ তারিখ থেকে জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন নীতি-২০১১ কার্যকর করা হয়। এ নীতির প্রধান একটি উদ্দেশ্য হচ্ছে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, দাতা সংস্থা, শিল্প এবং সরকারি ও বেসরকারি দক্ষতা প্রশিক্ষণ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের দক্ষতা উন্নয়ন কার্যাবলির ফলপ্রসূ পরিকল্পনা, সমন্বয় ও পরিবীক্ষণ আরো শক্তিশালী করা।

সংবিধানে বর্ণিত নীতি ও নির্দেশনাসমূহের বাস্তবায়ন ও প্রতিফলনে দক্ষ, জনবান্ধব, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক জনপ্রশাসন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে জারিকৃত সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮-এর সপ্তম অধ্যায় ১৭ ধারায় বলা হয়েছে যে ‘সরকারি কর্মচারীর পেশাগত দক্ষতা ও সক্ষমতার উত্তরোত্তর উত্কর্ষ সাধনের লক্ষ্যে, সরকার বা ক্ষেত্রমতো, উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ, সরকারের অনুমোদন সাপেক্ষে, প্রজাতন্ত্রের বিভিন্ন কর্ম বা কর্মবিভাগের উপযোগী করিয়া প্রশিক্ষণ সম্পর্কিত নীতিমালা প্রণয়ন করিতে পারিবে’। এক্ষেত্রে সরকার এবং অন্য কর্তৃপক্ষকে তাদের চাহিদা মোতাবেক প্রশিক্ষণসংক্রান্ত বিধিবিধান বা নীতিমালা জারি করার ক্ষমতা প্রদান করা হয়েছে।

সরকারের রুলস অব বিজনেস ১৯৯৬ অনুযায়ী জনপ্রশাসনে দেশে-বিদেশে প্রশিক্ষণসংক্রান্ত যাবতীয় সহায়ক ভূমিকা পালন করার দায়দায়িত্ব জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের। মন্ত্রণালয়ের অভিলক্ষ্য এবং রূপকল্পেও তার প্রতিফলন ঘটেছে। অভিলক্ষ্যটি এরূপ :‘নিয়োগ, প্রশিক্ষণ, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি ও মানবসম্পদের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিতকরণের মাধ্যমে একটি দক্ষ, সেবামুখী ও জবাবদিহিমূলক জনপ্রশাসন গড়ে তোলা। আর রূপকল্প হচ্ছে দক্ষ ও কার্যকর জনপ্রশাসন। উক্ত কার্যবিধিমালা অনুযায়ী প্রায় সবগুলো মন্ত্রণালয়/বিভাগ, বিশেষ করে ২৩টি মন্ত্রণালয়/বিভাগ তাদের নিজস্ব কর্মক্ষেত্রে অধীনস্থ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রশিক্ষণ প্রদানের বিষয়ে কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

২০১৩ সালে প্রণীত জাতীয় সামাজিক সুরক্ষা কৌশলপত্রের চতুর্থ অধ্যায়ে কর্মক্ষম নারী-পুরুষের, বিশেষ করে ১৫-২৫ বয়সি নারী-পুরুষের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে শ্রমবাজারের উপযোগী করে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।

বাংলাদেশ সরকার ২০৩০ সাল নাগাদ টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট (এসডিজি) বাস্তবায়নের লক্ষ্যে কৌশল ও কর্মপন্থা গ্রহণ করেছে। ৪ নম্বর লক্ষ্যমাত্রার আওতায় ৪খ, ৪গ টার্গেটসমূহে শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্ব প্রদান করা হয়েছে। তাছাড়া এসডিজির ৮ নম্বর লক্ষ্যমাত্রার ৬ নম্বর টার্গেটও যুব বয়সিদের কর্ম, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ প্রদানের বিষয়ে উল্লেখ করা হয়েছে।

জনপ্রশাসন প্রশিক্ষণ নীতিমালা, ২০০৩ (Public Administration Training Policy)-এর প্রস্তাবনায় বলা আছে যে, সরকারি খাতে পরিচালিত সব প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান একটি কার্যকরী, উদ্ভাবনী, দায়িত্বশীল, সত্ দায়বদ্ধ ও নিবেদিতপ্রাণ জনসেবা পদ্ধতি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে চাহিদানুযায়ী, যুগোপযোগী এবং কার্যকরী প্রশিক্ষণ কর্মসূচি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করবে।

এই নীতিমালাটি জনপ্রশাসনে প্রশিক্ষণসংক্রান্ত একটি যুগান্তকারী দলিল, যাতে প্রশিক্ষণ কৌশল, প্রশিক্ষণ কর্মসূচি, প্রশিক্ষণ ব্যবস্থাপনা, প্রশিক্ষণ পদ্ধতি, রিসোর্স পারসন ব্যবস্থাপনা, প্রশিক্ষক প্রণোদনা, প্রশিক্ষণার্থী প্রণোদনা, অর্থসংস্থান, প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনাসহ যাবতীয় বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। উক্ত নীতিমালার ৫.৩ অনুচ্ছেদে বলা আছে, প্রত্যেক মন্ত্রণালয়, বিভাগ, সরকারি, বেসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত সংস্থায় বাত্সরিক প্রশিক্ষণ পরিকল্পনা প্রণয়ন করবে এবং ৫ দশমিক ৫ অনুচ্ছেদে প্রশিক্ষণ সেল স্থাপন করার কথা বলা আছে।

জাতীয় প্রশিক্ষণ কাউন্সিলের নির্বাহী কমিটির ১৭তম সভায় জাতীয় প্রশিক্ষণ নীতিমালা (এনটিপি—National Training Policy) প্রণয়নের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় এবং তেপ্রক্ষিতে বিসিএস প্রশাসন একাডেমির তত্কালীন মহাপরিচালকের নেতৃত্বে একটি কমিটি করা হয়। কমিটির একাধিক সভায় দীর্ঘ আলাপ-আলোচনার পর জাতীয় প্রশিক্ষণ নীতিমালার একটি খসড়া ১৯ এপ্রিল ২০০৬ তারিখে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। সরকারি, আধাসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত কিংবা বেসরকারি সব সংস্থা/ প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রযোজ্য এ নীতিমালাটি নিয়ে বহু আলোচনা হলেও অদ্যাবধি চূড়ান্ত হয়নি।

দেশের প্রশিক্ষণবিষয়ক আইন, বিধি বা নীতিমালা প্রণয়ন, পর্যালোচনা বা যুগোপযোগীকরণ, সম্পদ বরাদ্দের দিকনির্দেশনা প্রদান, কর্মকাণ্ড মূল্যায়ন এবং সার্বিক দিকনির্দেশনা প্রদানের জন্য সর্বশেষ ৩১ মার্চ ২০১৯ তারিখে পুনর্গঠন করা হয় জাতীয় প্রশিক্ষণ কাউন্সিল বা National Training Council। এ কাউন্সিলের কর্মপরিধি সরকারি-বেসরকারি সব ক্ষেত্রে সম্প্রসারিত। প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে এ কাউন্সিলের সদস্যসংখ্যা ২২ জন। এ কাউন্সিলকে সহায়তা প্রদানের জন্য একটি নির্বাহী কমিটি গঠন করা হয়েছে, যার সভাপতি হচ্ছেন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে নিয়োজিত মন্ত্রী/প্রতিমন্ত্রী। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিপিটি উইং এ কাউন্সিল ও কমিটিকে সাচিবিক সহায়তা প্রদান করে থাকে। এ সম্পর্কে পরে আরো লিখব।

n লেখক : অবসরপ্রাপ্ত সচিব

সব খবর
এই বিভাগের আরো খবর