বৃহস্পতিবার ২২ আগস্ট, ২০১৯ ২০:২২ পিএম


আমরা পিছিয়ে, না অন্যরা এগিয়ে

সালাহ্‌উদ্দিন নাগরী

প্রকাশিত: ১৫:১৪, ২ আগস্ট ২০১৯  

উচ্চশিক্ষায় আমাদের অবস্থান কেমন; আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে সেটা দেখতে গেলে, বরাবরই দেখা যাচ্ছে আমরা পিছিয়ে যাচ্ছি। এগিয়ে যাচ্ছে অন্যান্য দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। এমনকি এশিয়া মহাদেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর মান সম্পর্কিত পরিচালিত জরিপে সেরা ৪১৭টি প্রতিষ্ঠানের একটি তালিকায় বাংলাদেশের কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নেই। এর আগেও ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি র‌্যাঙ্কিংয়ের বিভিন্ন জরিপে আমাদের কোনো প্রতিষ্ঠান ঠাঁই পায়নি। তখন এত কথা না হলেও এবার অনেক কিছু বলা ও পত্রপত্রিকায় লেখালেখি হচ্ছে। বিষয়টি অনেকটা এ রকম, বিশ্বপরিসরে ঠাঁই না-ইবা হলো, কিন্তু এশিয়ার তালিকাতেও কোনো প্রতিষ্ঠানের নাম থাকবে না- এ কেমন কথা!

দি টাইমস হায়ার এডুকেশন কর্তৃক ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি র‌্যাঙ্কিংয়ে ব্যবহূত ১৩টি সূচক এশিয়ার বিশ্ববিদ্যালয় র‌্যাঙ্কিংয়েও ব্যবহার করা হয়েছে। এর উল্লেখযোগ্য সূচক হলো :পাঠদান, গবেষণা, জ্ঞান-অভিজ্ঞতা বিনিময় ও আন্তর্জাতিক দৃষ্টিভঙ্গি। তালিকায় স্থান পাওয়া ২৭টি দেশের মধ্যে চীন, ভারত, ইরান, পাকিস্তান ও নেপালের যথাক্রমে ৭৯, ৪৯, ২৯, ৯ ও ১টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। হাজার বছরের সভ্যতার আমাদের এ জনপদের কোন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান `ইউনিভার্সিটি ওয়ার্ল্ড র‌্যাঙ্কিং` ও হাল আমলের `এশিয়ান ইউনিভার্সিটি র‌্যাঙ্কিং`-এর তালিকায় নেই। আগে তো আশপাশের দেশগুলোর চেয়ে আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের লেখাপড়ার মান ভালো ছিল। `প্রাচ্যের অক্সফোর্ড`খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চতুর্দিকে শিক্ষার আলো ছড়াত। এখন কি আমাদের লেখাপড়ার মান কমে গেছে? নাকি অন্যরা আরও বেশি গতিতে আমাদের ছাড়িয়ে যাচ্ছে? বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যমতে, ২০১৬ সালে বাংলাদেশের জনসংখ্যা প্রায় ১৬ কোটি ৮ লাখ। এর মধ্যে স্নাতক বা সমতুল্য, স্নাতকোত্তর বা সমতুল্য এবং ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার-কৃষিবিদের সংখ্যা ছিল যথাক্রমে ৫৩৩৮৬০, ২৯১০৪৮০ এবং ৬১১৪০। এই সংখ্যাগুলো বিগত কয়েক বছরে সঙ্গত কারণে আরও বেড়েছে। অন্যদিকে ১৫০ কোটি জনসংখ্যার চীনে বিগত বছরে গ্র্যাজুয়েটের সংখ্যা ৮০ লাখের সামান্য বেশি। আমাদের দেশে উচ্চশিক্ষিতের হার চীন অপেক্ষা অনেক বেশি। অথচ জ্ঞান-বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে ওরা কত এগিয়ে গেছে!

তারপরও আমাদের দেশে প্রতিনিয়ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠছে। হাজার হাজার শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষা নিচ্ছে। মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন না করা পর্যন্ত লেখাপড়া শেষ হয়েছে মনে করা হচ্ছে না। কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা বা গবেষণাধর্মী কিছু কিছু প্রতিষ্ঠানের চাকরি ব্যতীত এমএ, পিএইচডি বা উচ্চশিক্ষার প্রয়োজন পড়ে না। ইউরোপ, আমেরিকা ও পূর্ব এশিয়ার উন্নয়নশীল দেশগুলোতে উচ্চশিক্ষার ধারণাটি একেবারে ভিন্ন ধরনের। ওদের গ্র্যাজুয়েশন হয়ে গেল তো লেখাপড়া শেষ। গ্র্যাজুয়েশনকে আনুষ্ঠানিক শিক্ষার চূড়ান্ত ধাপ হিসেবে গ্রহণের মানসিকতা তৈরির উদ্যোগ আমাদেরও গ্রহণ করতে হবে। দেশের শিক্ষিত-সচেতন সমাজ এ ব্যাপারে অগ্রণী ভূমিকা নিতে পারে। যাদের প্রয়োজন উচ্চশিক্ষা, শুধু তাদের জন্য উন্মুক্ত রাখার পদ্ধতি বের করে উচ্চশিক্ষার মান বাড়ানোর চেষ্টা করা যেতে পারে। দেশ ও জাতি গঠনের পাশাপাশি প্রতিযোগিতার বিশ্বে নিজেদের অস্তিত্ব জানান দেওয়ার জন্য শক্তিশালী মানবসম্পদ তৈরিতে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার বিকল্প নেই। জীবনে চলার মতো, বিশ্বকে সঠিকভাবে উপলব্ধি করার জন্য যুগের চাহিদানির্ভর শক্তিশালী বেসিক এডুকেশন সবার দরকার। তার জন্য কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, শিক্ষার্থীর সংখ্যা ও কলেবর বৃদ্ধির কোনো যৌক্তিক কারণ নেই।

সম্প্রতি শিক্ষার্থীদের মধ্যে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তির পর থেকেই বিসিএস ও অন্যান্য প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতির প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এতে অনেক ক্ষেত্রে ক্লাসের লেখাপড়ায় মনোযোগ বিঘ্নিত হচ্ছে। প্রকারান্তরে সংশ্নিষ্ট প্রতিষ্ঠানে সার্বিক একাডেমিক পারফরম্যান্সের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে চাকরির সব পরীক্ষায় প্রত্যেক প্রার্থীর একাডেমিক অ্যাটেইনমেন্টের প্রতিফলন আরও জোরালোভাবে প্রবর্তনের চিন্তাভাবনা করা যেতে পারে।

আবাসিক হলগুলোতে অনেক শিক্ষার্থীকে এক রুমে গাদাগাদি করে থাকতে হয়। যাদের তাও জোটে না, তাদেরকে বিভিন্ন মেস, আত্মীয়-স্বজনের বাসাবাড়ি বা অন্যভাবে ব্যবস্থা করতে হয়, যেটা লেখাপড়ার জন্য খুব একটা অনুকূল নয়। অনেক প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন কোর্স ও সেমিস্টার সম্পন্ন করিয়ে থাকেন। একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ে একসঙ্গে ক্লাস নিতে প্রস্তুতি ও মনোসংযোগজনিত কোনো অসুবিধা হয় কি-না, তাও বিবেচনা করা যেতে পারে।

আমরা উন্নয়নশীল দেশের কাতারে শামিল হয়েছি। আমাদের উন্নয়নের সূচকগুলো ক্রম ঊর্ধ্বমুখী। মহাকাশেও আমাদের উপস্থিতি জানান দিয়েছি। আমাদেরও দু-চার-পাঁচটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক অঙ্গনে জায়গা করে নেওয়ার জন্য কাজ করতে হবে। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিখন-শিক্ষণ ও গবেষণা পরিবেশ উন্নত করা দরকার। আমাদের ছাত্ররাজনীতিকে দলীয় লেজুড়বৃত্তি না করে শিক্ষাকেন্দ্রিক আন্দোলনে সক্রিয় হতে হবে। এ ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও কর্তৃপক্ষ আন্তরিক হবেন বলেই বিশ্বাস।

সরকারি চাকরিজীবী
[email protected]
এডুকেশন বাংলা/এজেড

সব খবর
এই বিভাগের আরো খবর