সোমবার ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ১৬:৩৫ পিএম


আন্দোলন স্থগিত করেছে পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের শিক্ষক-কর্মচারী সংগঠন

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১২:৪৫, ১৬ আগস্ট ২০১৯  

বেতন ভাতার সঙ্কট সমাধানে এক মাসের সময় দিয়ে আন্দোলন আপাতত স্থগিত করেছে আন্দোলনরত সরকারী পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের সকল শিক্ষক-কর্মচারী সংগঠন। এই সময়ের মধ্যে শিক্ষা মন্ত্রণালয়, কারিগরি শিক্ষা অধিদফতর ও বোর্ড কার্যকর পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হলে সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে দ্বিতীয় শিফটের কোন কার্যক্রমে অংশ নেবেন না শিক্ষক-কর্মচারীরা। আন্দোলন স্থগিত করায় আগামী ২০ আগস্ট প্রতিষ্ঠান খোলার দিনই হবে নতুন শিক্ষা বর্ষে ভর্তির জন্য মনোনীত শিক্ষার্থীদের ওরিয়েন্টেশন। গত কয়েকদিনে শিক্ষামন্ত্রী, উপমন্ত্রীসহ কারিগরি শিক্ষা অধিদফতরের মহাপরিচালক ও বোর্ড চেয়ারম্যানের সঙ্গে কয়েক দফায় বৈঠকের পর নতুন শিক্ষার্থীদের ভর্তির স্বার্থে কর্মসূচী আপাতত স্থগিত করেছেন শিক্ষক-কর্মচারীরা।

বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় সঙ্কট সমাধানে এক মাসের সময় দিয়ে আন্দোলন স্থগিতের কথা নিশ্চিত করেছেন শিক্ষক নেতারা। তারা একই সঙ্গে বলেছেন, শিক্ষামন্ত্রীর প্রতিনিধি হিসেবে কারিগরি শিক্ষা অধিদফতরের মহাপরিচালক ও বোর্ড চেয়ারম্যান শিক্ষকদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। সেখানে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটের প্রতিনিধিরাও ছিলেন। মহাপরিচালক ও চেয়ারম্যানকে বলা হয়েছে এক মাসের মধ্যে সঙ্কটের সমাধান করতে হবে। তারাও একই সময়ের মধ্যে শিক্ষামন্ত্রী ও উপমন্ত্রীর মাধ্যমে বিষয়টি সমাধানের জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শরণাপন্ন হবেন। শিক্ষকরা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, বেতন ভাতা আগের ৫০ শতাংশ বেতন ভাতা বহাল ও পর্যাক্রমে ১০০ ভাগে উন্নীত করা না হলে শিক্ষক-কর্মচারীরা পলিটেকনিকের দ্বিতীয় শিফটের কাজে আর অংশ নেবেন না।

জানা গেছে, আগের ৫০ শতাংশ বেতন ভাতা বহাল ও পর্যাক্রমে ১০০ ভাগে উন্নীত করার দাবিতে শিক্ষক-কর্মচারীর আন্দোলনে গত ১ আগস্ট থেকেই পুরোপুরি অচল হয়ে পড়েছে সারাদেশের সকল সরকারী পলিটেকনিকের দ্বিতীয় শিফট। অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে হাজার হাজার শিক্ষার্থীর শিক্ষা জীবন। নতুন শিক্ষা বর্ষে ভর্তির জন্য মনোনীত হলেও ভর্তি হতে পারছিল না কোন শিক্ষার্থী। শিক্ষা মন্ত্রণালয় দফায় দফায় আশ^াস দিলেও শিক্ষকদের প্রাপ্য বেতন ভাতার জটিলতা নিরসন করতেও পারছে না। এমন পরিস্থিতিতে শিক্ষক-কর্মচারীরা তাদের পূর্ব ঘোষণা অনুসারে প্রথম শিফটের শিক্ষা কার্যক্রমে অংশ নিলেও পুরোপুরি বন্ধ রাখেন দ্বিতীয় শিফট। প্রথম শিফটের ২৫ হাজার শিক্ষার্র্থীর মতো দ্বিতীয় শিফটেও পড়ালেখা করার সুযোগ পায় আরও ২৫ হাজার শিক্ষার্থী। ফলে চার শিক্ষা বর্ষে প্রথম শিফটের মতো দ্বিতীয় শিফটেও পড়ার সুযোগ পাচ্ছে মোট ১ লাখ শিক্ষার্থী। আন্দোলনে এসব শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকরা পড়েন সঙ্কটে।

পরিস্থিতি সামাল দিতে বৈঠক হয় কয়েক দফা। শিক্ষামন্ত্রী ডাঃ দিপু মনি ও উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরীও শিক্ষকদের সঙ্গে বৈঠক করেন। এরপর তাদের হয়ে বৈঠক করেন অধিদফতর ও বোর্ড কর্মকর্তারা। তারা সঙ্কট সমাধানে ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় চান। তবে বৃহস্পতিবার শিক্ষক নেতারা এক মাসের সময় দেয়ার কথা নিশ্চিত করেছেন। বাংলাদেশ পলিটেকনিক শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের শিক্ষক জহিরুল ইসলাম জনকণ্ঠকে বলেছেন, দ্বিতীয় শিফট পরিচালনার জন্য এতদিন ৫০ শতাংশ বেতন ভাতা দেয়া হতো। পর্যায়ক্রমে এটা বাড়ানোর কথা। ২০১৫ সালের পে-স্কেলের পরেও সে অনুসারেই দেয়া হয়েছে ৫০ শতাংশ হারে। কিন্তু গত বছরের মাঝামাঝি অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক বিতর্কিত আদেশে হঠাৎ করে তা পুরনো স্কেলে নির্ধারণ করা হলেই সঙ্কট সৃষ্টি হয়েছে সারাদেশে। এতে শিক্ষকদের সম্মানী ভাতা কমেছে। নতুন এই আদেশ অমানবিক।

তিনি বলেন, সরকারের একটি কার্যকর বিষয়কে এভাবে অকার্যকর করা যায় না। আমরা এক মাসের সময় দিয়েছি। আগামী ২০ আগস্ট প্রতিষ্ঠান খোলার দিনই হবে নতুন শিক্ষা বর্ষে ভর্তির জন্য মনোনীত শিক্ষার্থীদের ওরিয়েন্টেশন। এক মাস আমরা আন্দোলন আপাতত স্থগিত করেছি। এই সময়ের মধ্যে শিক্ষা মন্ত্রণালয় সমস্যার সমাধান করবে। অন্যথায় আমরা আর দ্বিতীয় শিফটের কাজে অংশ নেব না।

বাংলাদেশ পলিটেকনিক শিক্ষক সমিতির সাবেক সভাপতি ও ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটের কো-চেয়ারম্যান নির্মল চন্দ্র সিকদার এখনও এ সঙ্কট নিরসনের উদ্যোগের সঙ্গে আছেন। একাধিক বৈঠকেও তিনি ছিলেন ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটের প্রতিনিধি হিসেবে। তিনি বলেছেন, সিদ্ধান্ত হয়েছে আন্দোলন এক মাসের জন্য স্থগিত থাকবে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশেই বৈঠক করেছেন মহাপরিচালক ও চেয়ারম্যান। তারা চেয়েছিলেন সঙ্কট সমাধানে ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় দেয়া হোক। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে মাঠ পর্যায়ে বিষয়টি নিয়ে চরম অসন্তোষ। তাই এক মাস সময় দেয়া হয়েছে। তারাও বলেছেন, এই সময়ের মধ্যে তারা শিক্ষামন্ত্রী ও উপমন্ত্রীর মাধ্যমে বিষয়টি সমাধানের জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শরণাপন্ন হবেন। এবং সমস্যার সমাধান হবে বলেই আশা করছেন কর্মকর্তারা।

এক প্রশ্নের জবাবে ঢাকা পলিটেকনিকের সাবেক এ শিক্ষক উদ্বেগ প্রকাশ করে বলছিলেন, আমরা মনে করি দেশের কারিগরি শিক্ষা উন্নয়নে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নেয়া সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ কোন বিশেষ মহল বিতর্কিত আদেশ দিয়ে নষ্ট করতে চাচ্ছে। এর মাধ্যমে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে, আবার কারিগরি শিক্ষা সম্পর্কে শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকদের মনে নেতিবাচক মনোভাব জন্ম নেবে। এ বিষয়ে আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করছি।

ঘটনা নিয়ে উদ্বিগ্ন ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউট। প্রতিষ্ঠানটির সাধারণ সম্পাদক মোঃ শামসুর রহমান বলছিলেন, যে পরিমাণ বেতন ভাতা কার্যকর ছিল কোন আদেশ দিয়ে তো তা কমানো যায় না। গত বছর অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক রহস্যজনক আদেশের কারণে আজ দেশের কারিগরি শিক্ষা বিস্তারের সবচেয়ে বড় উদ্যোগটি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আমি দ্রুত আগের মতোই ২০১৫ সালের স্কেলে ৫০ শতাংশ হারে বেতন ভাতা শুরু করার আহ্বান জানাচ্ছি। পর্যায়ক্রমে তা বাড়াতে হবে। এ বিষয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দ্রুত হস্তক্ষেপ কামনা করছি।

উল্লেখ্য, কারিগরি শিক্ষার হার বৃদ্ধির লক্ষ্যে ডিপ্লোমা-ইন-ইঞ্জিনিয়ারিং শিক্ষাক্রমে প্রথম শিফটের মতোই ২০০৪ সাল থেকে দ্বিতীয় শিফট চালু করা হয় এবং ৩০ শতাংশ হারে দ্বিতীয় শিফটের ভাতা ২০১৩ সালের জুন পর্যন্ত প্রদান করা হয়। ২০১৩ সালের জুলাই থেকে ২০১৫ সকালের জুন পর্যন্ত জাতীয় স্কেল ২০০৯ অনুযায়ী ৫০ শতাংশ হারে উন্নীত করা হয়। তারই ধারাবাহিকতায় ২০১৫ সালের জুলাই থেকে ২০১৮ সালের জুন পর্যন্ত জাতীয় বেতন স্কেল ২০১৫ অনুযায়ী ৫০ শতাংশ হারে সম্মানী প্রদান করা হয়।

কিন্তু হঠাৎ করে অর্থ মন্ত্রণাণলয় গত বছরের ৫ সেপ্টেম্বর এক প্রজ্ঞাপনে ২০১৮ সালের জুলাই থেকে জাতীয় স্কেল ২০০৯ অনুযায়ী ভাতা উত্তোলনের আদেশ দেয়। যা শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীরা মেনে নেয়নি ও ১ বছরের বেশি সময় দ্বিতীয় শিফটের কোন সম্মানী গ্রহণ করেনি।


এডুকেশন বাংলা /এজেড

সব খবর
এই বিভাগের আরো খবর