সোমবার ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ১২:০২ পিএম


আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীতে বিভিন্ন ধরনের বৈষম্যের অভিযোগ

জামাল উদ্দিন

প্রকাশিত: ১১:১২, ৩ জুন ২০১৯   আপডেট: ১১:১৩, ৩ জুন ২০১৯

আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীতে বিভিন্ন ধরনের বৈষম্যের অভিযোগ উঠেছে। বিসিএস আনসার, ব্যাটালিয়ন আনসার, অঙ্গীভূত সাধারণ আনসার, হিল আনসার, মহিলা আনসার ও ভিডিপি সদস্যদের মধ্যে ক্যাটাগরি ভেদে বৈষম্যেরও রকমফের রয়েছে। এরমধ্যে বিশেষ আনসার সদস্যরা গত ২০ বছর এবং হিল আনসার সদস্যরা ৩৩ বছর ধরে অস্থায়ীভাবে দৈনিক মজুরিভিত্তিতে কাজ করে আসছেন। কিন্তু তাদের চাকরি স্থায়ীকরণ হচ্ছে না। বিষয়টি নিয়ে তাদের মধ্যে চরম অসন্তোষ বিরাজ করছে। চাকরি স্থায়ীকরণ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনার পরও বিষয়টির সুরাহা হয়নি। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও আনসার সদর দফতর বিষয়টি নিয়ে আন্তরিকভাবে কাজ করছে না।

প্রেক্ষাপট
নব্বইয়ের দশকে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে চরমপন্থী সন্ত্রাসীদের উৎপাত চরম আকার ধারণ করে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীগুলোর যৌথ অভিযানেও নিয়ন্ত্রণে নেওয়া যাচ্ছিল না চরমপন্থীদের। ১৯৯৯ সালে সাধারণ ক্ষমা ও পুনর্বাসনের আশ্বাস দিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে চরমপন্থীদের আত্মসমর্পণ করতে বলা হয়। তখন বিভিন্ন গ্রুপের দুই হাজার ১২৬ জন চরমপন্থী সদস্য অস্ত্র জমা দিয়ে আত্মসমর্পণ করে। যাচাই-বাছাই শেষে যাদের বিরুদ্ধে কোনও ফৌজধারি অভিযোগ কিংবা মামলা ছিল না, তাদের মধ্য থেকে ৭৬৫ জনকে অস্থায়ীভাবে ‘বিশেষ আনসার’ হিসেবে নিয়োগ দিয়ে পুনর্বাসন করা হয়। পরে কেউ কেউ চাকরি ছেড়ে পালিয়ে যান। বর্তমানে ৪৮০ জন ‘বিশেষ আনসার’ সদস্য পুলিশের সঙ্গে বিভিন্ন থানায় কাজ করছেন। কথা ছিল, তাদের চাকরি স্থায়ী করে ব্যাটালিয়ন আনসারে আত্মীকরণ করা হবে। কিন্তু গত ২০ বছরেও তাদের চাকরি স্থায়ী করা হয়নি।

এদিকে, পাহাড়ি জনপদের নিরাপত্তায় ১৯৮৬ সাল থেকে বিভিন্ন বাহিনীর সঙ্গে অস্থায়ীভাবে কাজ করছেন ৬০০ হিল আনসার সদস্য। সরকার প্রধানের প্রতিশ্রুতি ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে নির্দেশনা থাকলেও তাদের চাকরিও স্থায়ী হয়নি গত ৩৩ বছরে। কবে নাগাদ বিশেষ ও হিল আনসারদের চাকরি স্থায়ী হবে, তাও সুনির্দিষ্ট করে সংশ্লিষ্টরা বলতে পারছেন না।

প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি ও চাকরিতে যৌগ্যতার শৈথিল্য

২০১৬ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি আনসার একাডেমিতে আনসার সদস্যদের এক দরবারে বিশেষ আনসার ও হিল আনসার সদস্যদের চাকরি স্থায়ীকরণের বিষয়ে প্রতিশ্রুতি দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বিষয়টিকে মানবিক উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী তখন সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব উত্থাপন করারও নির্দেশনা দেন সংশ্লিষ্টদের। কিন্তু সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনা প্রধানমন্ত্রীর দফতরে উত্থাপনের কোনও তথ্য পাওয়া যায়নি। বিশেষ আনসার ও হিল আনসারদের চাকরি স্থায়ীকরণে চাকরি বিধিমালার নিয়োগনীতিতেও একবারের শর্ত শিথিল করেছেন রাষ্ট্রপতি। এরপরও তাদের ভাগ্যের চাকা ঘুরছে না।

বিশেষ আনসার ও হিল আনসারদের জন্য পদ সৃষ্টিতে আনসার সদর দফতরের চিঠি

অঙ্গীভূত ৬০০ জন হিল আনসার সদস্য ও ৪৮০ জন বিশেষ আনসার সদস্যের চাকরি স্থায়ীকরণে পদ সৃষ্টি প্রসঙ্গে আনসার সদর দফতর থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেওয়া হয় ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে। ওই চিঠিতে বলা হয়, ১৯৯৮ সালে দেশের দক্ষিণাঞ্চলে বিরাজমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অভিযানের সময় বিপথগামীদের মধ্যে অনেকেই আত্মসমর্পণ করে। তাদের মধ্য থেকে যাচাই-বাছাই শেষে পুনর্বাসনের লক্ষ্যে ১৯৯৯ সালের ২৬ জুলাই ৭৬৫ জন সদস্যকে ‘বিশেষ আনসার’ হিসেবে অঙ্গীভূত করা হয়। তাদের মধ্যে বর্তমানে ৪৮০ জন পুলিশের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন।

চিঠিতে আরও বলা হয়, পার্বত্য এলাকার পুনর্বাসন জোনগুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তায় ২৪ পদাতিক ডিভিশনের চাহিদা অনুযায়ী ১৯৮৬-৮৭ অর্থবছর থেকে খাগড়াছড়ি জেলায় ৪৮০ জন এবং রাঙ্গামাটি জেলা ১২০ জন হিল আনসার সদস্যকে অঙ্গীভূত করা হয়।
প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে মহিলা আনসারদের মতো হিল ও বিশেষ আনসারদের এক হাজার ৮০টি পদ স্থায়ীকরণে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে চিঠিতে অনুরোধ জানানো হয়। এছাড়া পুনর্বাসিত নারী আনসারদের অস্থায়ীভাবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। তাদের মধ্যে ৬৭২ জন নারীর চাকরি পুনর্বাসনের অংশ হিসেবে ২০১৪ সালে স্থায়ীকরণ করা হয়।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অসম্মতি

গত ৫ ফেব্রুয়ারি (২০১৯) অঙ্গীভূত ৬০০ জন হিল আনসার সদস্য ও ৪৮০জন বিশেষ আনসারের চাকরি স্থায়ীকরণের জন্য এক হাজার ৮০টি পদ সৃষ্টির বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে আনসারের মহাপরিচালক বরাবরে একটি চিঠি দেওয়া হয়।

বিশেষ ও হিল আনসারদের চাকরি স্থায়ীকরণে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অসম্মতির কথা জানিয়ে মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব এম কে হাসান মাহমুদ স্বাক্ষরিত চিঠিতে বলা হয়, হিল আনসার ও বিশেষ আনসার হিসেবে নিয়োগ প্রাপ্তদের ব্যাটালিয়ন আনসার প্রবিধানমালা-১৯৯৬ অনুযায়ী অঙ্গীভূতকরণের নির্ধারিত যোগ্যতা না থাকায় হিল ও বিশেষ আনসারের চাকরি স্থায়ীকরণের জন্য প্রস্তাবিত এক হাজার ৮০টি পদ সৃষ্টির বিষয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় অসম্মতি জানায়।’

তবে, আবারও হিল ও বিশেষ আনসারদের চাকরি স্থায়ীকরণের ব্যাপারে গত ২৯ মে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে পুনর্বিবেচনার জন্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে।

এদিকে, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আনসার শাখা-১-এর এক প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, ‘সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৩৩-এর শর্তের অংশে প্রদত্ত ক্ষমতাবলে রাষ্ট্রপতি সংবিধানের ১৪০(২) অনুচ্ছেদের বিধান মোতাবেক বাংলাদেশ সরকারি কর্মকমিশনের সঙ্গে পরামর্শক্রমে বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর আনসার ক্যাডার বহির্ভূত, ‘নন ক্যাডার কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োগ বিধিমালা ২০১০’-এর সংশোধন করেন। সরাসরি আনসার নিয়োগের ক্ষেত্রে কর্মরত অঙ্গীভূত হিল আনসার ও বিশেষ আনসারদের সৃষ্ট পদে নিয়মিতকরণের ক্ষেত্রে বিবেচ্য সব শর্ত কেবল একবারের জন্য শিথিলও করেন।’

বিশেষ আনসার আবদুল আলীমের বক্তব্য
ঢাকা মহানগর পুলিশে কর্মরত বিশেষ আনসার সদস্য আবদুল আলীম জানান, ১৯৯৯ সালে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের সন্ত্রাসীদের আত্মসমর্পণ করান। তখন থেকে তিনি বিশেষ আনসার হিসেবে অস্থায়ীভাবে চাকরি করছেন। যে চাকরির কোনও স্থায়িত্ব নেই। দৈনিক হাজিরাভিত্তিতে তারা কর্মরত আছেন। তিনি বলেন, ‘১৯৯৯ সালের জুলাইয়ে যখন বিশেষ আনসারদের নিয়োগ দেওয়া হয়, তখন বেতন ছিল ২ হাজার ২০০ টাকা। আর ২০ বছর পরে এসে পাচ্ছি মাত্র ১৩ হাজার টাকা। এই টাকা দিয়ে পরিবার পরিজন নিয়ে চলতে খুবই কষ্ট হয়। আমরা অমানবিক জীবন যাপন করছি।’

আবদুল আলীম আরও বলেন, ‘জীবিকার তাগিদে গাজীপুরের সফিপুরের আনসারদের এক দরবারে প্রধানমন্ত্রীর কাছে বিষয়টি আমরা উপস্থাপন করি। তখন তিনি সদয় হয়ে আমাদের বিশেষ আনসার ও হিল আনসারদের চাকরি জাতীয়করণের জন্য আনসারের সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেন। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, আমাদের চাকরি স্থায়ী করা হবে।’ তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী যেখানে সদয় হয়ে নির্দেশ দিয়েছেন, রাষ্ট্রপতি যেখানে অন্তত একবারের জন্য নিয়োগের যোগ্যতার বিষয়টি ক্ষমা করেছেন, সেখানে কেন আমাদের এত কাঠখড় পোহাতে হচ্ছে বুঝতে পারছি না।’

হিল আনসার সাইফুল ইসলামের বক্তব্য

রাঙ্গামাটিতে কর্মরত হিল আনসার সদস্য হাবিলদার সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘সদর দফতর থেকে বলা হয়েছে, আমাদের চাকরি স্থায়ীকরণে কাজ চলছে। শুরু থেকেই হিল আনসারে কাজ করছি।’ তিনি বলেন, ‘আশায় আছি, যদি চাকরিটা স্থায়ী হয়। তাহলে শেষ বয়সে হলেও একটু শান্তি পাব।’

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিবের বক্তব্য

প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি ও রাষ্ট্রপতির প্রমার্জনের পরও কেন আনসার সদস্যদের চাকরি স্থায়ীকরণ হচ্ছে না—জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব (আনসার) হাবিব মো. হালিমুজ্জামান বলেন, ‘এটা তো শুধু স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাজ নয়। চাকরি স্থায়ীকরণে অন্যান্য মন্ত্রণালয়ও এর সঙ্গে যুক্ত। তাদের অসম্মতি থাকলে তো স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কিছু করার নেই। তবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে কাজ করে যাচ্ছে।’ বিষয়টি বিবেচনার জন্য লেখালেখি হচ্ছে বলেও তিনি জানান।

সৌজন্যে: বাংলা ট্রিবিউন

এডুকেশন বাংলা/এজেড

সব খবর
এই বিভাগের আরো খবর