বুধবার ১৬ অক্টোবর, ২০১৯ ১৮:১৩ পিএম


অব্যবস্থাপনা আর জটিলতায় ২৮ হাই-টেক পার্ক

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ০৮:১৪, ১৭ ডিসেম্বর ২০১৮   আপডেট: ০৮:১৫, ১৭ ডিসেম্বর ২০১৮

তথ্যপ্রযুক্তি খাতে কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে ছয়টি প্রকল্পের অধীনে সারা দেশে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে ২৮টি হাই-টেক বা সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্ক। এসব পার্ক বাস্তবায়নের দায়িত্বে রয়েছে হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষ। যদিও নানা জটিলতায় সময়মতো বাস্তবায়ন হচ্ছে না এসব টেকনোলজি পার্ক। বাস্তবায়ন হলেও থাকছে অব্যবস্থাপনা। এতে বিনিয়োগে আগ্রহ হারাচ্ছেন এ খাতের উদ্যোক্তারা। এ নিয়ে অসন্তোষও রয়েছে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে।

দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে আইসিটি শিল্পের সুষম বিকাশ ও উন্নয়নে যশোর সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্ক প্রকল্পটি অনুমোদন হয় ২০১৩ সালে। প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয় ৪৭ কোটি ৯৫ লাখ টাকা। একই বছরের সেপ্টেম্বরে এটি বাস্তবায়নের মেয়াদ ধরা হয়। প্রকল্পের দ্বিতীয় সংশোধনী গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে অনুমোদন দেয় জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক)। এতে ব্যয় বেড়ে হয় ২৫৩ কোটি ৯ লাখ টাকা। মেয়াদ বাড়ানো হয় একই বছরের জুন পর্যন্ত। বাস্তবায়ন শেষে গত বছরের ১০ ডিসেম্বর এটি উদ্বোধন করা হয়। যদিও অব্যবস্থাপনায় প্রকল্পটির কাঙ্ক্ষিত সুফল মিলছে না।

সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, শহরের বেজপাড়া-শংকরপুরে স্থাপন করা সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্ক এলাকায় মুখোমুখি দাঁড়িয়ে দৃষ্টিনন্দন ও সুউচ্চ দুটি ভবন। এর একটি মূল ভবন ও অন্যটি আবাসন সুবিধার জন্য নির্মাণ করা হয়েছে। এর বাইরে রয়েছে আরো দুটি ভবন। সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্ক এলাকার মধ্যেই এক পাশে স্থাপন করা হয়েছে জাতীয় ডাটা সেন্টারের ডিজাস্টার রিকভারি সেন্টারটি। উদ্বোধনের এক বছর পরও এলাকাটির ভেতরে এখনো কর্মচাঞ্চল্যের ছাপ পড়েনি। ১৫ তলা মূল ভবনে গিয়েও দেখা যায়, বিভিন্ন তলার অধিকাংশ স্থান এখনো অব্যবহৃত।

জানা গেছে, স্থানীয় একটি তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানকে জায়গা বরাদ্দ দিতে গত বছরের ২৭ অক্টোবর প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে চুক্তি করে বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষ (বিএইচটিপিএ)। প্রতি বর্গফুট ১০ টাকা হারে প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে চুক্তি হয়। একই মাসের ৩১ তারিখে প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি হিসেবে বিএইচটিপিএর সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয় টেকসিটি বাংলাদেশ। পরবর্তী সময়ে টেকসিটির সঙ্গে চুক্তি করা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে যশোরের শেখ হাসিনা সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্কে (এসএইচএসটিপি) জায়গা নিতে ভাড়া হিসেবে গুনতে হয়েছে প্রতি বর্গফুটে ১২ টাকা হারে।

প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি (পিএমসি) হিসেবে শেখ হাসিনা সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্কের সার্বিক ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম পরিচালনায় গত বছরের ৩১ অক্টোবর বিএইচটিপিএর সঙ্গে চুক্তি করে টেকসিটি বাংলাদেশ। চুক্তির আওতায় ১৫ বছর এ সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্কের সব ধরনের রক্ষণাবেক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন করবে প্রতিষ্ঠানটি।

টেকসিটি বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ওয়াহিদ শরীফ বলেন, হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আগেই কিছু প্রতিষ্ঠানের চুক্তি হয়েছে। ফলে এক্ষেত্রে আমাদের করণীয় নেই। তবে পিএমসি নিয়োগের আগে এ ধরনের চুক্তিতে সমস্যা তৈরি হতে পারে বলে জানানো হয়েছিল।

বৈষম্যের অভিযোগ শুধু বিএইচটিপিএর সঙ্গে চুক্তি করা প্রতিষ্ঠানগুলোরই নয়, বরং পিএমসির সঙ্গে চুক্তি করা একাধিক প্রতিষ্ঠানও এমন অভিযোগ করেছে। বিএইচটিপিএকে এ বিষয়ে গত আগস্টে ইমেইলের মাধ্যমে জানানোও হয়েছে। এমনই একটি প্রতিষ্ঠান মাইলাইটহোস্টের স্বত্বাধিকারী রকিবুর রহমান বলেন, অন্যদের চেয়ে আমাদের বেশি ভাড়া পরিশোধ করতে হচ্ছে। চুক্তির মেয়াদও দুই বছর, যেখানে তাদের সঙ্গে বিএইচটিপিএ চুক্তি করেছে পাঁচ বছর মেয়াদে। এসব বিষয় নিয়ে কর্তৃপক্ষকে জানানো হলেও এখন পর্যন্ত কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।

বিষয়টি খতিয়ে দেখতে শিগগিরই উদ্যোগ নেয়া হবে বলে জানান বিএইচটিপিএর ব্যবস্থাপনা পরিচালক (সচিব) হোসনে আরা বেগম। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, তাদের সমস্যা হলে জানাতে পারে। তবে এখন পর্যন্ত এ ধরনের কোনো অভিযোগ পাইনি।

সামগ্রিকভাবে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগে উদ্যোক্তারা আরো আগ্রহী হয়ে উঠেছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্কগুলোয় কর অবকাশসহ নানা সুবিধা দিচ্ছে সরকার। এতে পার্কে স্থান বরাদ্দ পেতে প্রচুর আবেদন আসছে। ফলে আরো সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্ক স্থাপন করা যেতে পারে।

শেখ হাসিনা সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্কের স্থান বরাদ্দে এরই মধ্যে ৫০টির বেশি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি হয়েছে। এখন পর্যন্ত ২৫টি প্রতিষ্ঠান কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এর মধ্যে ১৪টি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে পিএমসি নিয়োগের আগে চুক্তি করে বিএইচটিপিএ। এতে কাজ করছে প্রায় ৫০০ জনবল।

কালিয়াকৈরে স্থাপন করা বঙ্গবন্ধু হাই-টেক সিটি বাস্তবায়নেও সময় লেগেছে দুই দশক। সাম্প্রতিক কালে এটিতে বেশকিছু প্রতিষ্ঠানকে ভূমি বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এটিতেও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে দোদুল্যমানতায় ছিলেন উদ্যোক্তারা।

হাই-টেক পার্কগুলোর অন্যতম ঢাকার জনতা টাওয়ার সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্ক। এখানে ১৫টি স্টার্ট-আপ কোম্পানিকে জায়গা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এর বাইরে আরো ৪০টি স্টার্ট-আপ কোম্পানিকে কো-স্পেস সুবিধা দেয়া হয়েছে। সরকারি হিসাব বলছে, এখানে ৮০০ মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে।

গাজীপুর জেলার কালিয়াকৈরে হাই-টেক পার্ক স্থাপনের নীতিগত সিদ্ধান্ত হয় ১৯৯৯ সালে। এজন্য বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশনস কোম্পানি লিমিটেডের (বিটিসিএল) মালিকানাধীন ২৩২ একর জমি হাই-টেক পার্ক প্রকল্পে দেয়া হয়। প্রাথমিকভাবে ২০০৭ সালের মধ্যে এটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হয়। বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় আসার পর থমকে যায় এ প্রকল্পের কাজ। বর্তমান সরকারের মেয়াদে প্রকল্পের অনেকখানি অগ্রগতি হলেও পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন এখনো হয়নি।

২০১১ সালের আগস্ট থেকে ২০১৬ সালের জুন পর্যন্ত স্থায়ী এ প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয় ৫৪৫ কোটি ২৩ লাখ টাকা। এ প্রকল্পের মাধ্যমে হাই-টেক পার্কে প্রশাসনিক ভবন, সীমানাপ্রাচীর, আন্তর্জাতিক মানের গেটওয়ে, অভ্যন্তরীণ রাস্তা, বৈদ্যুতিক সাবস্টেশন, পাম্প হাউজ ও গভীর নলকূপ, গ্যাস লাইন, ইন্টারনেট সংযোগ, টেলিফোন সাব-এক্সচেঞ্জ এবং আনসার শেড নির্মাণ করা হয়। হাই-টেক সিটিতে ডেভেলপার নিয়োগে নতুন করে দরপত্র আহ্বান করা হলে আবেদন করে সাত প্রতিষ্ঠান। এর মধ্য থেকে দুটি প্রতিষ্ঠানকে নিয়োগ দেয়া হয়। প্রতিষ্ঠানগুলো নিজ নিজ ব্লকে উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

সারা দেশে ছয়টি প্রকল্পের আওতাধীন হাই-টেক বা সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্কগুলোর অন্যতম রাজধানীর জনতা টাওয়ার সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্ক। ২০১০ সালে ডিজিটাল বাংলাদেশ টাস্কফোর্সের প্রথম সভায় জনতা টাওয়ারকে দেশের প্রথম সফটওয়্যার পার্ক হিসেবে গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত হয়। বিভিন্ন প্রক্রিয়া শেষ করে সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্ক হিসেবে এটিকে গড়ে তুলতে দায়িত্ব দেয়া হয় টেকনোপার্ক লিমিটেডকে। তবে যথাযথভাবে ও নির্ধারিত সময়ে কাজ সম্পন্ন করতে না পারার অভিযোগে ২০১৩ সালে টেকনোপার্কের সঙ্গে চুক্তি বাতিল করা হয়। পরবর্তী সময়ে মামলাসহ নানা জটিলতা শেষে এটির উদ্বোধন হয় ২০১৫ সালের অক্টোবরে। এতে ১৫টি স্টার্ট-আপ ছাড়াও ৪০টি স্টার্ট-আপ কোম্পানিকে কো-স্পেস সুবিধা দেয়া হয়েছে। বিএইচটিপিএর তথ্যমতে, এটিতে ৮০০ মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে।

সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলায় বাস্তবায়ন করা হচ্ছে ‘সিলেট ইলেকট্রনিকস সিটি’। ২০১৬ সালের জানুয়ারি থেকে শুরু হওয়া এ প্রকল্প শেষ হওয়ার কথা চলতি বছরের ডিসেম্বরে। এতে কর্মসংস্থানের লক্ষ্যমাত্রা ৫০ হাজার মানুষের। বিভাগীয় শহর রাজশাহীতে হচ্ছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব হাই-টেক পার্ক। এটি বাস্তবায়নের মেয়াদ ধরা হয়েছে ২০১৬ সালের জুলাই থেকে ২০১৯ সালের জুন পর্যন্ত। এখানে ১৪ হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

এমনকি খোদ রাজধানীতে রাজধানীর কড়াইল মৌজায় ৪৭ একর জমি মহাখালী আইটি ভিলেজ স্থাপনের জন্য নির্বাচন করা হলেও এখন পর্যন্ত সেটির কোনো অগ্রগতি নেই।

হাই-টেক পার্ক নির্মাণের পাশাপাশি তথ্যপ্রযুক্তি খাতে দক্ষ জনবল তৈরির লক্ষ্যে সাতটি ট্রেনিং অ্যান্ড ইনকিউবেশন সেন্টার নির্মাণ করছে বিএইচটিপিএ। সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ, চট্টগ্রাম বন্দর, নাটোরের সিংড়া, কুমিল্লা সদর, নেত্রকোনো সদর, বরিশাল সদর ও মাগুরা সদরে ট্রেনিং অ্যান্ড ইনকিউবেশন সেন্টারের জন্য স্থান নির্বাচন করা হয়েছে।

সাবেক ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার বলেন, তথ্যপ্রযুক্তিকেন্দ্রিক এ ধরনের বিশেষায়িত ব্যবস্থা তৈরির উদ্যোগটি ইতিবাচক। বিশ্বের অনেক দেশই এ ধরনের উদ্যোগ নিয়ে এগিয়ে গেছে। আমাদের এখানে এগুলো বাস্তবায়ন করতে গিয়ে ছোটখাটো যেসব সমস্যা দেখা দিচ্ছে তা মূলত অভিজ্ঞতা না থাকার কারণে। সরকারের সঙ্গে উদ্যোক্তাদের কোনো বিরোধ নেই। বরং আমাদের দেশে উদ্যোক্তারা শুরুতে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগের বিষয়ে কিছুটা দোদুল্যমানতায় ছিলেন। ধীরে ধীরে সে অবস্থা পাল্টাচ্ছে।

সৌজন্যে:বণিক বার্তা

এডুকেশন বাংলা/এজেড

সব খবর
এই বিভাগের আরো খবর