শনিবার ২১ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ২১:৪০ পিএম


অবসর সুবিধা বোর্ডের আর্থিক অসঙ্গতি দূর হোক

মো. শাহজাহান আলম সাজু

প্রকাশিত: ০৯:৫৪, ২ জুন ২০১৯  

দেশের শিক্ষাব্যবস্থার গোড়াপত্তন থেকেই শিক্ষকতা পেশায় দেশের সল্ফ্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তানরাই শুধু দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে বিনা বেতনে শিক্ষকতা পেশায় আসতেন। স্বাধীন বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু সরকার শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়নের লক্ষ্যে ৩৬ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণের পাশাপাশি বেসরকারি কলেজ শিক্ষকদের বেতন ১০০ টাকা এবং স্কুল শিক্ষকদের বেতন ৭৫ টাকা নির্ধারণ করেন (তখন অধ্যক্ষ কিংবা প্রধান শিক্ষকদের আলাদা কোনো বেতন ছিল না)। উল্লেখ্য, বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীরা সারাজীবন চাকরি করে এক সময় শূন্য হাতে বাড়ি ফিরতেন। তাদের কোনো `পেনশন` ব্যবস্থা ছিল না। অবসর গ্রহণের পর শিক্ষার্থীরা চাঁদা তুলে শিক্ষকদের বিদায় অনুষ্ঠানে তাদের হাতে ছাতা, জায়নামাজ, লাঠি, তসবিহ তুলে দিত। বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের অবসরকালীন দুরবস্থার কথা চিন্তা করেই বঙ্গবন্ধু সরকার তাদের জন্য কল্যাণ ট্রাস্ট প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ করে। `৭৫-এর ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর সেই উদ্যোগ আর বাস্তবায়িত হয়নি। শিক্ষকদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে এরশাদ সরকার ১৯৯০ সালে কল্যাণ ট্রাস্ট চালু করে। কিন্তু মাত্র ছয় মাস সচল থাকার পর ১৯৯১ সালে কল্যাণ ট্রাস্ট বন্ধ করে দেওয়া হয়। ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত খালেদা জিয়া সরকার কল্যাণ ট্রাস্ট বন্ধ রাখে। ১৯৯৬ সালে জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদ্যোগে কল্যাণ ট্রাস্ট পুনরায় চালু করা হয়। কল্যাণ ট্রাস্টের আইন অনুযায়ী শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতনের ২ শতাংশ টাকা কল্যাণ ফান্ডে জমা করা হয় এবং তাদের অবসরকালীন সময়ের সর্বশেষ বেতন স্কেল অনুযায়ী যত বছর চাকরি তত মাসের (১৯৯০ সাল থেকে) সমপরিমাণ টাকা কল্যাণ সুবিধা প্রদান করা হয়। ২০০৬ সালে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর কল্যাণ ট্রাস্ট বন্ধের সিদ্ধান্ত কার্যকর করতে পারেনি।

কল্যাণ ট্রাস্টের কার্যক্রম ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত বন্ধ থাকায় ছয় বছর শিক্ষকদের চাঁদা ফান্ডে জমা না হওয়ায় শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে বার্ষিক পাঁচ টাকা চাঁদা ২০০২ সালে বন্ধ করে দেওয়া এবং জাতীয় পে স্কেলে শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে নতুন স্কেলে তাদের কল্যাণ ও অবসর ভাতা প্রদান করতে গিয়ে এই আর্থিক সংকট দেখা দেয়। উল্লেখ্য, ১৯৮০ সালে বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের জাতীয় বেতন স্কেলে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। পর্যায়ক্রমে জাতীয় স্কেলে ১০০ শতাংশে বেতন উন্নীত হয়। ২০০৬ সালে ৯০ শতাংশ থেকে ১০০ শতাংশে উন্নীত করতে শিক্ষকদের আন্দোলনে, রাজপথের মিছিলে পুলিশের হামলায় আমি নিজে আহত হয়েছিলাম। ২০০৯ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করার পর সপ্তম জাতীয় পে স্কেলে শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন ৬২ শতাংশ বৃদ্ধির ফলে কল্যাণ ট্রাস্ট ও অবসর বোর্ডে আর্থিক সমস্যা দেখা দেয়। কারণ কল্যাণ ট্রাস্টে ২ শতাংশ এবং অবসর বোর্ডে ৪ শতাংশ করে যে চাঁদা জমা হয়, তা দিয়ে অর্ধেক আবেদনও নিষ্পত্তি করা সম্ভব হয় না। ফলে বছর শেষে বিপুলসংখ্যক আবেদন অনিষ্পন্ন থেকে যায়। ২০১৫ সালে অষ্টম জাতীয় বেতন স্কেলে শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন ১০০ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। ফলে কল্যাণ ও অবসর বোর্ডে নতুন স্কেলে তাদের পাওনা পরিশোধ করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, ২০১৫ সালের ৩০ জুন একজন কলেজ অধ্যক্ষ অবসর গ্রহণ করলে তিনি ২৫ হাজার টাকা স্কেলে কল্যাণ ও অবসর বোর্ড থেকে প্রায় ২৩ লাখ টাকা পেয়ে থাকেন অথচ একদিন পর অর্থাৎ ২০১৫ সালের ১ জুলাই যিনি অবসর গ্রহণ করেছেন, তিনি পাবেন দ্বিগুণ অর্থাৎ প্রায় ৪৬ লাখ টাকা। কল্যাণ ট্রাস্টের আইন অনুযায়ী ১৯৯০ সাল থেকে তিনি কল্যাণ সুবিধা পেয়ে থাকেন। অথচ `৯০ সাল থেকে সেই অধ্যক্ষ ছিলেন প্রভাষক। তার স্কেল ছিল মাত্র ১৬৫০ টাকা। তখন বেতন ছিল জাতীয় বেতন স্কেলের ৮০ শতাংশ অর্থাৎ ওই অধ্যক্ষ তখন জমা দিয়েছেন ১৬৫০ টাকার ৮০ শতাংশের ২ শতাংশ। তিনি নূ্যনতম ১২ বছর প্রভাষক ছিলেন। অথচ আইন অনুযায়ী সর্বশেষ তার প্রাপ্ত অধ্যক্ষের ৫০ হাজার টাকা স্কেলে `৯০ সাল থেকে পরিশোধ করতে হচ্ছে। অনুরূপ প্রধান শিক্ষকসহ অন্যান্য স্তরেও একইভাবে সুবিধা প্রদান করতে হয়। ফলে দেখা যায়, একজন শিক্ষক কিংবা কর্মচারী চাঁদা বাবদ যে অর্থ জমা দেন, তার প্রায় ১৮-১৯ গুণ বেশি টাকা তিনি কল্যাণ ও অবসর সুবিধা পেয়ে থাকেন। কিন্তু এই অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দ না থাকায় কল্যাণ ও অবসর বোর্ডে আর্থিক সংকট প্রকট আকার ধারণ করে।

২০১৫ সালে জাতীয় বেতন স্কেলে বেতন দ্বিগুণ বৃদ্ধির কারণে কল্যাণ ট্রাস্ট ও অবসর সুবিধা বোর্ডে চরম আর্থিক সংকট দেখা দেয়। অর্থের অভাবে প্রায় ৭৫ হাজার শিক্ষক-কর্মচারীর আবেদন অনিষ্পন্ন অবস্থায় পড়ে থাকে। এমতাবস্থায় সংস্থা দুটির চেয়ারম্যান শিক্ষা সচিব এই সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। এ ব্যাপারে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একাধিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। অর্থ মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য হলো, শিক্ষক-কর্মচারীরা কল্যাণ এবং অবসর সুবিধা বোর্ডে ৬ শতাংশ চাঁদা দিয়ে আগে যে সুবিধা পেতেন, নতুন স্কেলে তার দ্বিগুণ সুবিধা পাচ্ছেন। সুতরাং তাদের চাঁদার পরিমাণ দ্বিগুণ অর্থাৎ ১২ শতাংশ হওয়া উচিত। আমি সেদিন সেই সভায় বলেছিলাম, শিক্ষকরা যে বেতন পান, সেই টাকায় তাদের সংসার চালানো অনেক কষ্টসাধ্য। আমি সরকার থেকে অর্থের ব্যবস্থা করার অনুরোধ করি। অনেক যুক্তিতর্কের পর অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকদের দুরবস্থার কথা বিবেচনা করে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সেই সভায় শিক্ষকদের চাঁদা বৃদ্ধি করে সরকার থেকেও অর্থ বরাদ্দের পাশাপাশি এই সমস্যা সমাধানের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। অর্থ মন্ত্রণালয় ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের যৌথ সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কল্যাণ ট্রাস্ট ও অবসর সুবিধা বোর্ডের সংকট নিরসনের জন্য অর্থ মন্ত্রণালয় ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৭০০ কোটি টাকা, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ২০০ কোটি টাকা এবং ২০১৮-১৯ অর্থবছরে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ তহবিল থেকে ৭৫৭ কোটি টাকা বিশেষ বরাদ্দ দেওয়া হয়। অর্থ মন্ত্রণালয়ের শর্ত অনুযায়ী কল্যাণ ও অবসর সুবিধা বোর্ডের চাঁদা বৃদ্ধি না করায় এই অর্থ আটকে দেয়। তখন শিক্ষা মন্ত্রণালয় গেজেট প্রকাশ করতে বাধ্য হয়; কিন্তু পরবর্তীকালে শিক্ষকদের দাবির মুখে তা স্থগিত করা হয়।

কল্যাণ ট্রাস্ট এবং অবসর সুবিধা বোর্ডে প্রতি মাসে যে পরিমাণ চাঁদা জমা হয়, তার দ্বিগুণের বেশি অর্থের প্রয়োজন পড়ে। বছরে যে পরিমাণ চাঁদা জমা হয়, তা দিয়ে অর্ধেক আবেদন নিষ্পত্তি করা সম্ভব হয়। বাকি অর্ধেক আবেদন অনিষ্পন্ন থেকে যায়। এবার ৫ শতাংশ ইনক্রিমেন্ট চালু হওয়ার ফলে শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন সরকারি চাকরিজীবীদের অনুরূপ প্রতি বছর চক্রবৃদ্ধি হারে বাড়তে থাকবে। ফলে ১০ বছর পর কল্যাণ ও অবসর সুবিধা বোর্ডের শিক্ষক-কর্মচারীদের পাওনার পরিমাণ দ্বিগুণ হয়ে যাবে। এ ছাড়া সরকার থেকে যদি নতুন কোনো সুবিধা প্রদান করা হয়, তাহলে কল্যাণ ট্রাস্ট এবং অবসর সুবিধা বোর্ডের আর্থিক সংকট আরও বেড়ে যাবে। চাঁদার পরিমাণ বৃদ্ধি কিংবা সরকারি বরাদ্দ না দেওয়া হলে সংস্থা দুটি অকার্যকর হয়ে পড়বে। ফলে লাখ লাখ অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারী তাদের পাওনা থেকে বঞ্চিত হবেন। অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের শেষ আশ্রয়স্থল কল্যাণ ট্রাস্ট ও অবসর সুবিধা বোর্ডের সংকট নিরসনের জন্য অতীতে কোনো সরকার উদ্যোগ গ্রহণ করেনি। অবসর বোর্ডে এককালীন ৮৯ কোটি টাকা সিড মানি দেওয়া হলেও কল্যাণ ট্রাস্ট প্রতিষ্ঠার পর থেকে একটি টাকাও কোনো সরকার বরাদ্দ দেয়নি। বর্তমান শিক্ষাবান্ধব শেখ হাসিনা সরকার গত তিন অর্থবছরে এই দুটি সংস্থায় শিক্ষক-কর্মচারীদের চাঁদা বৃদ্ধির শর্তে প্রায় ১৬২৭ কোটি টাকা বিশেষ বরাদ্দ দেয়। ওই বরাদ্দের পরও শিক্ষকদের চাঁদা বৃদ্ধি না করা হলে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সুস্পষ্ট শর্ত রয়েছে, তারা এ খাতে নতুন করে আর কোনো অর্থ বরাদ্দ দেবে না। এমতাবস্থায় শিক্ষক ও সরকার উভয়কেই বিষয়টি বিবেচনা করতে হবে।

বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে ৪৮ বছর। দীর্ঘ ৩০ বছর ক্ষমতায় ছিল আওয়ামীবিরোধী শক্তি। গত দশ বছর শেখ হাসিনা সরকার শিক্ষা খাতে যে যুগান্তকারী উন্নয়ন করেছে, গত ৩৮ বছরেও তা হয়নি। ২৬ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণ, প্রতিটি উপজেলা সদরে একটি করে স্কুল ও কলেজ জাতীয়করণ, বেসরকারি শিক্ষকদের মেডিকেল ও বাড়ি ভাড়া বৃদ্ধি, ৫ শতাংশ ইনক্রিমেন্ট, ২০ শতাংশ বৈশাখী ভাতা প্রদান, কল্যাণ ও অবসর সুবিধার জন্য ১৬২৭ কোটি টাকা বিশেষ বরাদ্দ, মাদ্রাসা শিক্ষকদের বেতন বৈষম্য দূরীকরণ, সারাদেশে শিক্ষাঙ্গনে ব্যাপক হারে অবকাঠামো উন্নয়ন, জেলায় জেলায় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তবে সরকারি-বেসরকারি বৈষম্য দূর হওয়া প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয়করণ করা হলে শিক্ষার মান ও শিক্ষার মর্যাদাও বৃদ্ধি পাবে।

সাবেক ছাত্রনেতা, সাধারণ সম্পাদক, স্বাধীনতা শিক্ষক পরিষদ; সচিব, শিক্ষক-কর্মচারী কল্যাণ ট্রাস্ট, শিক্ষা মন্ত্রণালয়
[email protected]
এডুকেশন বাংলা/এজেড

সব খবর
এই বিভাগের আরো খবর