শনিবার ২১ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ২১:০৪ পিএম


অনিয়মের মাধ্যমে ক্যাডারভুক্ত করতে গিয়ে মৃত ব্যক্তিকেও নিয়োগ!

এস এম আব্বাস

প্রকাশিত: ০৮:১৮, ৭ জুন ২০১৯   আপডেট: ০৯:৪২, ৭ জুন ২০১৯

বিসিএস (জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল) ক্যাডারে অন্তর্ভুক্ত করতে গিয়ে মৃত ব্যক্তিকেও নিয়োগ (এনক্যাডারমেন্ট) দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে হয়েছে। শুধু তাই নয়, রুলস অব বিজনেস পাস কাটিয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ও পিএসসির অনুমোদন না নিয়ে ৯৫ জন কর্মকর্তাকে ক্যাডারভুক্ত করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় সরকার বিভাগের গত ২২ জানুয়ারি প্রকাশিত গেজেটে এই নিয়োগ দেওয়া হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

সূত্র জানায়, গত ২ জানুয়ারি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় বিসিএস জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল ক্যাডারে পদসংখ্যা ১৩৬ থেকে বাড়িয়ে ৩২৯-তে উন্নীত করার গেজেট প্রকাশ করে। অন্যদিকে গত ২২ জানুয়ারি স্থানীয় সরকার বিভাগের যুগ্ম-সচিব মো. খাইরুল ইসলাম স্বাক্ষরিত অন্য একটি গেজেটে বাড়তি এসব পদে নন-ক্যাডার ও প্রকল্পের ৯৫ কর্মকর্তাকে ক্যাডারে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এসব কর্মকর্তা নন-ক্যাডার ও বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প থেকে সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতরে নিয়োগ পান।

গেজেট পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, গেজেটের তিন নম্বর তালিকায় স্থান পেয়েছেন মো. আনোয়ার হোসেন তালুকদার। সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে ‘১৮ জেলা পানি সরবরাহ প্রকল্পে’ তিনি যোগদান করেন ১৯৯১ সালের ২৭ জুলাই। পরে ২০০০ সালের ১ জুলাই তাকে রাজস্ব বাজেটে পদায়ন করা হয় এবং সর্বশেষ ২০১৪ সালের ২৩ জুন সহকারী প্রকৌশলী পদে তার চাকরি নিয়মিত করা হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বেশ কিছুদিন থেকে তিনি অসুস্থ ছিলেন। গেজেট প্রকাশের আগে ২০১৮ সালের ২৭ ডিসেম্বরে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। এছাড়া, দুর্নীতির অভিযোগ মাথায় নিয়ে ছুটিতে বিদেশ গিয়ে অননুমোদিতভাবে দীর্ঘদিন ধরে অবস্থান করছেন এমন ব্যক্তিও রয়েছেন ক্যাডারভুক্তির তালিকায়।
এধরনের ঘটনা ছাড়াও নানা অনিয়মের মাধ্যমে ক্যাডার পদে ৯৫ কর্মকর্তাকে অন্তর্ভুক্ত করার অভিযোগ রয়েছে। এসব অনিয়মের কারণে গেজেট প্রকাশের পর থেকে চরম অসন্তোষ সৃষ্টি হয় অধিদফতরের বিভিন্ন পর্যায়ে। এমনকি ওই গেজেট চ্যালেঞ্জ করে উচ্চ আদালতে মামলাও হয়েছে।
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতরের কর্মকর্তাদের অভিযোগ, ক্যাডার পদ বাড়ানোর সরকারি সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ করা হলেও নন-ক্যাডার ও প্রকল্প থেকে রাজস্বখাতে নিয়মিত করা এসব কর্মকর্তাকে ক্যাডার হিসেবে অন্তর্ভুক্তিতে প্রচলিত বিধি লঙ্ঘন করা হয়েছে। মিথ্যা তথ্য উপস্থাপন করে ক্যাডারে অন্তর্ভুক্তির গেজেটটি প্রকাশ করা হয়েছে। ক্যাডার হওয়ার দিন থেকে নয়, সরকারি চাকরিতে যোগদানের দিন থেকেই ক্যাডার হিসেবে নিয়োগ দেওয়ায় কর্মকর্তাদের জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণ নিয়েও চরম বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়েছে।
ক্যাডার পদ বাড়ানোর সংশ্লিষ্ট গেজেটে বলা হয়, ‘১৯৮০ সালের বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল) কম্পোজিশন অ্যান্ড ক্যাডার রুলস তফসিল সংশোধন করে ক্যাডার পদ সংখ্যা ১৩৬ থেকে ৩২৯ এ উন্নীত করা হয়েছে। তফসিল সংশোধনের সময় সৃষ্ট পদে কর্মরত স্থায়ী ও নিয়মিত ৯৫ জন কর্মকর্তাকে ক্যাডারে অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারি কর্মকমিশন (বিপিএসসি) সচিবালয়ের সুপারিশ এবং মহামান্য রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের পর জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতরের ৯৫ কর্মকর্তাকে রাজস্ব বাজেটে পদায়ন ও যোগদানের তারিখ থেকে বিসিএস (জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল) ক্যাডারে অন্তর্ভুক্ত করে প্রজ্ঞাপন জারি করা হলো।’
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলের নির্বাহী প্রকৌশলী গোলাম রব্বানী ও ঊর্ধ্বতন উপপ্রকল্প পরিচালক মো. আতিকুল ইসলামসহ অন্যান্য কর্মকর্তারা বলেন, ‘কেউ ক্যাডার বহির্ভূত কর্মকর্তাদের ক্যাডারভুক্ত করার বিরুদ্ধে নয়। কিন্তু ১৯৮১ সালের বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস নিয়োগ বিধিমালা সংশোধন না করে ক্যাডার বহির্ভূত কর্মকর্তাদের ক্যাডারে অন্তর্ভুক্তির সুযোগ নেই।

এক্ষেত্রে নিয়োগ বিধির সংশ্লিষ্ট ধারা সংশোধন করা হয়নি। নন-ক্যাডার ও প্রকল্পের কর্মকর্তাদের ক্যাডারে অন্তর্ভুক্ত করতে, কিংবা ১৯৮১ সালের বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস নিয়োগ বিধি সংশোধনে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়েরও কোনও সুপারিশ নেওয়া হয়নি। অথচ রুলস অব বিজনেস ১৯৯৬ অনুযায়ী, ক্যাডার পদে নিয়োগ বা ক্যাডারভুক্তির বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা শুধু জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের।

গেজেটে বলা হয়েছে, ক্যাডারভুক্তির বিষয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ও পিএসসির সুপারিশ নেওয়া হয়েছে। তবে প্রকৃতপক্ষে ক্যাডারভুক্তির বিষয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে পিএসসিতে কোনও প্রস্তাব পাঠানো হয়নি বলে জানা গেছে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ও পিএসসি’র সংশ্লিষ্ট সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ও পিএসসি শুধুমাত্র ক্যাডার পদ বাড়ানোর সম্মতি দেওয়া হলেও কোন কর্মকর্তা কোন তারিখে ক্যাডারভুক্ত হবেন, তার কোনও সুপারিশ করেনি। শুধু তাই নয়, রাষ্ট্রপতির কাছে পদ বাড়ানোর যে সারাংশ পাঠানো হয়, সেখানেও ৯৫ জন কর্মকর্তাকে ক্যাডারভুক্ত করার কোনও উল্লেখ নেই। কৌশলে বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। পদ বাড়ানোর গেজেট প্রকাশের অনুমোদন চাওয়া হলেও কোন কোন কর্মকর্তা ক্যাডারে অন্তর্ভুক্ত হবেন, সে বিষয়ে কোনও প্রকার সম্মতি চাওয়া হয়নি। পদ বাড়ানোর গেজেট প্রকাশের অনুমোদন নিয়ে শূন্যপদে নন-ক্যাডার কর্মকর্তা ও প্রকল্পের ৯৫ সহকারী প্রকৌশলীকে ক্যাডারভুক্ত করা এক ধরনের জালিয়াতি। এটি প্রচলিত নিয়ম ও বিধি-বিধান মেনেই যদি করা যেতো, তাহলে মৃত ব্যক্তি এবং অননুমোদিত ছুটিতে যাওয়া কোনও কর্মকর্তা ক্যাডারভুক্ত হতেন না।

http://www.educationbangla.com/media/PhotoGallery/2019March/cader20190607034046.jpg

সংশ্লিষ্ট দলিলাদি থেকে জানা গেছে, ১৯৯৪ সালের ‘অ্যাডহক-ভিত্তিক নিযুক্ত কর্মচারী নিয়মিতকরণ বিধিমালা’ অনুযায়ী নিয়মিত করা কোনও কর্মচারী ক্যাডারে অন্তর্ভুক্ত হলে সর্বশেষ ব্যাচে তার জ্যেষ্ঠতার অবস্থান নির্ধারিত হবে। আর ১৯৯৫ সালের উন্নয়ন প্রকল্প থেকে রাজস্ব বাজেটে স্থানান্তরিত পদধারীদের নিয়মিতকরণ ও জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণ বিধিমালায় বলা হয়েছে, ‘ক্যাডারভুক্তির তারিখ থেকে সংশ্লিষ্ট ক্যাডারে জ্যেষ্ঠতা গণনা করা হবে।’ অথচ যোগদানের তারিখ থেকে ক্যাডারভুক্তি করার কথা বলা আছে গেজেটে। ফলে সিনিয়র ক্যাডাররাও এখন জ্যেষ্ঠতার দিক থেকে নতুন ক্যাডারভুক্তদের পেছনে পড়ে গেছেন।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব এসএম গোলাম ফারুকের সঙ্গে একাধিকবার মোবাইলফোনে যোগাযোগ করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। এমনকী মোবাইলে এসএমএস পাঠিয়ে তার বক্তব্য জানতে চাওয়া হয়,কিন্তু তিনি কোনও জবাব দেননি।

তবে স্থানীয় সরকার বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (পানি সরবরাহ অনুবিভাগ) মো. জহিরুল ইসলাম বলেন, ‘প্রজ্ঞাপনটি কার্যকর হয়নি। এটি নিয়ে অভিযোগ রয়েছে। আমি সম্প্রতি এখানে যোগদান করেছি। নিয়োগ পাওয়া একজন আগেই মারা গেছেন বলেও শুনেছি।তবে এ বিষয়ে মন্তব্য করার আমি কেউ নই। তাছাড়া, আদালতে এ বিষয়ে মামলাও রয়েছে।’
জানতে চাইলে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিব ফয়েজ আহমদ বলেন, ‘ডকুমেন্ট না দেখে এ বিষয়ে আমি কিছু বলতে পারবো না।’

সূত্র:বাংলা ট্রিবিউন

এডুকেশন বাংলা/এজেড

সব খবর
এই বিভাগের আরো খবর