শনিবার ৩০ মে, ২০২০ ১৪:২৮ পিএম


অনলাইন শিক্ষা : আমরা কতটা প্রস্তুত?

ড. সৈয়দ রাশিদুল হাসান

প্রকাশিত: ০৩:৫৭, ১০ মে ২০২০  

অনলাইন শিক্ষাব্যবস্থা আমাদের দেশে কোনো নতুন ধারণা নয়। ইতঃপূর্বেও আমরা অনলাইন শিক্ষাব্যবস্থার প্রচলন দেখেছি। তবে বর্তমানে করোনাভাইরাসের পরিপ্রেক্ষিতে বন্ধ হয়ে যাওয়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় কীভাবে ছাত্রছাত্রীদের অনুপস্থিতিতে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করা যায়, তারই চিন্তাসূত্রে অনলাইন পদ্ধতির কথা আবার উঠে এসেছে। অনেক প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় তাদের ছাত্রছাত্রীদের জন্য এরই মধ্যে অনলাইনে শিক্ষা প্রদান শুরু করে দিয়েছে। বেশকিছু ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল তাদের অনলাইন কার্যক্রম শুরু করেছে।

প্রথমদিকে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) এ বিষয়ে আপত্তি দেখালেও পরবর্তী সময় কোনো কোনো মহলের চাপে কিছুটা শিথিলতা দেখাতে বাধ্য হয়েছে। এরপর শিক্ষামন্ত্রীর অনলাইনের পক্ষে সাফাই গাওয়া সরকারি প্রজ্ঞাপন বিষয়টিকে বারুদের মতো ভাইরাল করে দিয়েছে। এখন যে কোনো প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় মনে হয় ইউজিসিকে তোয়াক্কা না করেই ‘কারিগরিতে অত্যন্ত অগ্রসরমান জাতির’ মতো অনলাইনের যথেচ্ছ ব্যবহার শুরু করেছে। এতে স্বাভাবিকভাবেই এই শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে অনেক প্রশ্নের উদয় হচ্ছে।

আমার ৪৪ বছরের শিক্ষাগত জীবনের অভিজ্ঞতা থেকেই বর্তমান বিষয়টি দেখার চেষ্টা করছি। আমরা সব সময়ই প্রচলিত প্রাতিষ্ঠানিক বা ক্লাসরুম শিক্ষাব্যবস্থায় অভ্যস্ত ও অনুরক্ত। অনলাইনে লেখাপড়া করাইনি এমন কোনো কথা নেই। আমি এখনও ভারতের ইন্দিরা গান্ধী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিজিটিং অধ্যাপক হিসেবে কিছু ক্লাস অনলাইনে নিই। অনলাইন ক্লাসের জন্য তাদের পূর্ণাঙ্গ স্টুডিও আছে। ছেলেমেয়েরা এতে অভ্যস্ত। অনলাইন এডুকেশন দিয়ে শিক্ষা কার্যক্রম চালানোর জন্য পূর্ণাঙ্গ প্রস্তুতি থাকতে হবে। আমাদের কি তা আছে? বলা হচ্ছে, আমাদের উপজেলা পর্যন্ত কিংবা কোনো কোনো ক্ষেত্রে তারও নিচ পর্যন্ত কোথাও কোথাও টেলিভিশন বা আইটি সেন্টার আছে। তবে এগুলো কী অবস্থায় আছে, ক’জনকে সেবা দিতে পারবে, যারা ওখানে আছেন তাদের অনলাইন এডুকেশনের অভিজ্ঞতা আছে কিনা ইত্যাদি নানা প্রশ্ন আসে। অনলাইন এডুকেশন যদি সব অসুখের প্যানাসিয়া হতো তবে আজ পৃথিবীব্যাপী এত বিশ্ববিদ্যালয়, এত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন হতো না বা থাকত না শিক্ষা, স্বাস্থ্য, হসপিটালিটি ইত্যাদি সেবাভিত্তিক প্রতিষ্ঠান। এখানে কিছু ক্ষেত্রে টেকনোলজির ব্যবহার বাড়লেও ঢালাওভাবে টেকনোলজির ব্যবহার সম্ভব নয়। সেবা ক্ষেত্রে মানুষ ‘হিউম্যান টাচ’ শুধু পছন্দ করে না, হিউম্যান টাচ তারা আশাও করে। কোনো শিক্ষক তার ক্লাসে না গিয়ে রেকর্ডকৃত টেপ ছেড়ে এসে রুমে বসে থাকল, সেই শিক্ষক মোটেই ভালো শিক্ষক হতে পারে না। এসব ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত মানবিক ছোঁয়াটা খুবই প্রয়োজন।

কথায় কথায় আমরা চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের কথা বলি। ভালো কথা, এক নীরব বিপ্লব সংঘটন হয়ে যাচ্ছে। আর তা হচ্ছে রোবটের বিপ্লব, আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স, ভার্চুয়াল রিয়ালিটি আর অন্যান্য আইটিভিত্তিক উন্নয়নের মাধ্যমে। ডাক্তারকে সরিয়ে শুধু রোবট দিয়ে অপারেশন চালানো হলে রোগী অপারেশন টেবিলে যাবে কিনা, চিন্তা করবে শতবার। স্বয়ং যুক্তরাষ্ট্রেই এটিএম বুথের গ্রহণযোগ্যতা বাড়তে দীর্ঘ ২৫ বছর সময় লেগেছিল। আর ক্লাসে রক্তমাংসের শিক্ষক ছাড়া রোবট দিয়ে শিক্ষা দিলে পরবর্তী প্রজন্ম রোবট হিসেবেই বেড়ে উঠবে, মানুষ হিসেবে নয়। সব ক্ষেত্রে টেকনোলজির এতই যদি সুবিধা হতো, তাহলে এখনও বড় বড় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিক্ষা নগরী, হাসপাতাল, হোটেল, এমনকি শিল্পকারখানাও গড়ে উঠত না। সরকারকেও লাখ লাখ কোটি টাকা খরচ করে লাখ লাখ ডাক্তার, শিক্ষক, নার্স, কর্মকর্তা নিয়োগের ব্যবস্থা করতে হতো না। রোবট আর ভার্চুয়াল রিয়ালিটি দিয়েই সব কাজ সেরে ফেলা যেত।

আসলে টেকনোলজি দিয়ে সব সমস্যার সমাধান হয় না। কিছু কাজ ত্বরান্বিত করা যায়, কোয়ালিটির কিছু উন্নয়ন করা যায়, সময় বাঁচানো যায়, খরচ কমানো যায়। এসব ঠিক আছে। কিন্তু সিস্টেমকে দুমড়েমুচড়ে পরিবর্তন করে টেকনিক্যালাইজেশন সম্ভব নয়।

আমার জানামতে, ইউজিসি অনলাইন এডুকেশনের ঘোর বিরোধী ছিল। কিন্তু বিশেষত প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর চাপে পড়ে তাদের সিদ্ধান্ত শিথিল করতে বাধ্য হয়েছে। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের বিগত সেমিস্টার ছিল শেষ পর্যায়ে। এরপর হয়তো আর ক’টা ক্লাস, পরীক্ষা ইত্যাদি শেষ হয়ে গেলেই এই সেমিস্টার শেষে তারা আবার নতুন ভর্তি বাণিজ্যে ঝাঁপিয়ে পড়ত। ওটাই হচ্ছে তাদের মোদ্দা কথা। অর্থই হচ্ছে মুখ্য- যেনতেনভাবে ক্লাস শেষ করে আরও দ্রুততার সঙ্গে পরীক্ষা নিয়ে সেমিস্টার শেষ করে দাও। এরপর অর্থ কামাও।

প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অনলাইন শিক্ষাব্যবস্থা দেখে আমি ব্যক্তিগতভাবে হতাশ। শুধু তা-ই নয়, শিক্ষক ও ছাত্রছাত্রীদের অবস্থা দেখে আমি রীতিমতো চিন্তিত। বহু ছেলেমেয়ে আর কিছু শিক্ষক বর্তমানে ঢাকার বাইরে অবস্থান করছে। গ্রামে ইন্টারনেট ব্যবস্থা খুবই সীমিত; মেসেঞ্জার কিংবা জুমে যোগাযোগ অসম্ভব। কয়েকজন শিক্ষক ও ছাত্রকে বলতে শুনেছি, নেটওয়ার্কের জন্য তাদেরকে গাছে উঠে চেষ্টা করতে হয়। তা-ও পাওয়া যায় না। অনেক শিক্ষক এতকিছু করেও এখনও নাকি বেতন পাননি। কই আজ পর্যন্ত তো কোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় তাদের কোনো একাডেমিক কর্মকাণ্ড অনলাইনে চালানোর প্রয়োজনীয়তা অনুভব করল না? পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্ববিদ্যালয়। তাদের ছাত্রছাত্রীর সংখ্যাও অনেক এবং বেশির ভাগই গ্রামকেন্দ্রিক। কোনো সুবিধা নেই অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম চালানোর। আর একটা কথা হল, আমাদের পুরো শিক্ষাব্যবস্থা, লেখাপড়ার সিস্টেম, পরীক্ষা পদ্ধতি, এমনকি প্রশ্নপত্র প্রণয়নের ধরন, খাতা দেখা ইত্যাদি কোনো কিছুই অনলাইনের উপযুক্ত নয়। সীমিত আকারে অনলাইন সিস্টেমে যেতে হলেও এগুলোর পুরোপুরি পরিবর্তন প্রয়োজন।

সবশেষে বলি, অনেকে সময়ের দিকে অঙুলি তোলেন। ছাত্রছাত্রীদের জীবনের মূল্যবান সময় নাকি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। আমি তাদের বলতে চাই, দেশ ও বিশ্ব এক যুদ্ধের মধ্যে আছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আমরা সবচেয়ে কঠিন বাস্তবতার মধ্যে পড়েছি। সামনে ভয়ংকর বিপদ। সবাই যোদ্ধা এই পরিস্থিতিতে। আমাদের এখন যুদ্ধ করে যেতে হবে; পৃথিবী, দেশ আর মানুষকে বাঁচাতে হবে। মানবতাকে বাঁচাতে হবে। এ পরিপ্রেক্ষিতে জীবন থেকে ৬-৯ মাস ঝরে গেলেও তা মেনে নিতে হবে। ইউজিসির বর্তমান চেয়ারম্যান আমার সতীর্থ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এক ব্যাচের ছাত্র ছিলাম। আমাদের চোখের সামনে কত ভয়ংকর ঘটনার আমরা সাক্ষী। তিনি ঠিকই বলেছিলেন, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় আমাদের জীবন থেকে দুই-দুইটা বছর হারিয়ে গেছে। ১৯৭৩ সালে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি পেয়ে বের হওয়ার কথা থাকলেও আমরা বের হই ১৯৭৫-এর শেষ প্রান্তে। তো আমাদের জীবন কি শেষ হয়ে গেছে? আমরা তো ঠিকই সমাজে আসীন। এরশাদ সাহেবের সময় ঘন ঘন সাইনে ডাই হতে দেখেছি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে। কিন্তু কই, কাউকে তো বলতে শুনিনি, স্যার আমি বেকার। তাই বলি, শুধু অর্থের কারণে দেশের শিক্ষাব্যবস্থাটার ক্ষতি করবেন না। ইউজিসিকে অনুরোধ করি, এ মুহূর্তে ঢালাওভাবে অনলাইন কার্যক্রম চালানোর অনুমতি না দিয়ে কিছু সময় নিন, পরিস্থিতি অবলোকন করুন। আর ছাত্রছাত্রীদের বলি, তোমরা তো আমাদের মুক্তিযুদ্ধের স্বাদ পাওনি, করোনার বিরুদ্ধে এই যুদ্ধে সার্বিকভাবে অংশ নিয়ে দেশকে নতুন করে জানতে শেখো, দেশের মানুষকে অনুভব করতে শেখো।

ড. সৈয়দ রাশিদুল হাসান : অধ্যাপক, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ম্যারিটাইম বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা; সাবেক অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

সব খবর
এই বিভাগের আরো খবর